পরিচ্ছেদঃ ২
বিদায় মাহে রমযান কিছু ভাবনা
সম্মানিত ভ্রাতৃবৃন্দ, নিশ্চয় রমযান মাস নৈকট্য লাভ এবং গুনাহ থেকে পবিত্র হবার উত্তম সময়। এটি আপনাদের ও তাদের জন্য সাক্ষ্য হয়ে থাকবে যারা এ সময় নিজ কর্মসমূহ উত্তমরূপে সম্পাদন করে থাকে। যারা সৎ কর্ম সম্পাদন করার সুযোগ পেয়েছে তারা যেন আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করে এবং উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ গ্রহণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ উত্তম কর্ম সম্পাদনকারীকে প্রতিদান দান করবেন। আর যে ব্যক্তি পাপ কাজ করে তার তাওবা করা উচিত। কেননা যিনি তাওবা করেন আল্লাহ তার তাওবা কবুল করে থাকেন।
আল্লাহ তা‘আলা আপনাদের জন্য রমযানের শেষের দিকে কিছু বাড়তি ইবাদতের বিধান দান করেছেন। সেগুলো তাঁর নৈকট্য লাভের পথকে সুগম করবে এবং আপনাদের ঈমানকে বৃদ্ধি করবে।
আল্লাহ তা‘আলা আরো নির্দেশ দিয়েছেন, সাদকাতুল ফিতর, তাকবীর ও ঈদের সালাত-এর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلِتُكۡمِلُواْ ٱلۡعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ﴾ [ البقرة : ١٨٥ ]
“আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর আর যাতে তোমরা শোকরিয়া আদায় কর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫]
তাকবীরের বাক্য হলো,
اللهُ أكْبَرُ اللهُ أكْبَرُ لاَ إلَهَ إَلاَّ الله ُ اللهُ أكْبَرُ اللهُ أكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
এ তাকবীর পুরুষদের জন্য উচ্চস্বরে পড়তে বলা হয়েছে। তাই তারা মসজিদে, বাজারে এবং নিজ বাড়ীতে উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করবে। তাকবীর পাঠের সময় অবশ্যই অন্তরে আল্লাহর বড়ত্ব, তাঁর মর্যাদার কথা স্মরণে রাখবে। আরও স্মরণ করবে তাঁর অসংখ্য নি‘আমতকে এবং সে সব নি‘আমতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে সে তাকবীর পাঠ করছে। নারীরা তাকবীর পাঠ করবে অনৈচ্চস্বরে।
মানুষের অবস্থা বড়ই চমৎকার। প্রতি মুহূর্তে এবং প্রতিটি স্থানে যথাযথ সম্মানের সাথে তারা আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদা প্রকাশ করে থাকে। রমযান শেষ হওয়ার সময় তাঁর বড়ত্ব প্রকাশার্থে তাকবীর পাঠ করে থাকে। তাকবীর, তাহমীদ ও তাহলীলের গুঞ্জরণের মাধ্যমে আকাশ পর্যন্ত পৃথিবী মুখরিত করে তুলে। তারা আল্লাহ তা‘আলার রহমত কামনা করে ও তাঁর ‘আযাবকে ভয় করে।
মহান আল্লাহ ঈদের দিন নিজ বান্দাদের ওপর ঈদের সালাতের বিধান দান করেছেন। আল্লাহর মহত্ব প্রকাশের এটি সর্বোত্তম পন্থা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন সকল মুসলিমকে ঈদের সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। আরো নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশের। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَلَا تُبۡطِلُوٓاْ أَعۡمَٰلَكُمۡ ٣٣ ﴾ [ محمد : ٣٣ ]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রাসূলের। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।” [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ৩৩]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদেরকে ঈদের দিন ঈদগাহে যাবার অনুমতি দিয়েছেন। এটি ঈদের সালাতের গুরুত্ব প্রমাণ করে উম্মে আতীয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন বের হতে বলেছেন। তবে গোলাম, ঋতুবর্তী ও অসুস্থদের কথা ভিন্ন। ঋতুবর্তীরা সালাতের স্থান থেকে দূরে অবস্থান করবে। তারা মুসলিমদের ভালো কাজের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের যাদের পরিধেয় বস্ত্র নেই তারা কী করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা এক বোন অপর বোন থেকে নিয়ে পরিধান করবে। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের সালাতে যাওয়ার পূর্বে খেজুর খাওয়া সুন্নত। ১টি, ৩টি, ৫টি এমনিভাবে বেজোড় সংখ্যায় আরো বেশি খেতে পারে।
আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন সর্বপ্রথম খেজুর আহার করতেন। আর খেজুর তিনি বেজোড় সংখ্যায় খেতেন। (আহমাদ ও সহীহ বুখারী)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থতা, দূরত্ব বা এ জাতীয় কোনো ওযর না থাকলে ঈদের মাঠে পায়ে হেঁটে যেতেন। বাহনে চড়ে যেতেন না। যেমন আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন, ঈদের সুন্নত হলো পায়ে হেটে ঈদগাহে যাওয়া। (তিরমিযী, হাসান)
পুরুষদের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া ও উত্তম পোষাক পরিধান করা সুন্নত। সহীহ বুখারীতে ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু চাকচিক্যময় ঝলমলে একটি রেশমি পোষাক বাজার থেকে ক্রয় করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন, আমি এটি ঈদের দিন পরিধান জন্য খরিদ করেছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি তোমার জন্য বানানো হয় নি। কাপড়টি রেশমি হওয়াতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি বলেছেন। কারণ, রেশমি কাপড় ও স্বর্ণ ইসলামে পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে।
ঈদের দিন নারীরা সুগন্ধি ব্যবহার ও সৌন্দর্য্য প্রকাশ না করে অর্থাৎ যথাযথ পর্দার সাথে সালাতের জন্য বের হতে পারবে। কেননা, নারীরা পর্দার ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছে এবং সুগন্ধি লাগিয়ে, সৌন্দর্য্য প্রকাশ করে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে।
সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে আল্লাহভীতি ও তিনি আল্লাহর সামনে উপস্থিত আছেন এমন মন নিয়ে সালাত আদায় করবে। বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করবে। তাঁর কাছে দো‘আ করবে। তাঁর রহমতের আশা ও শাস্তিকে ভয় করবে।
সকল মানুষের সাথে একত্রে মসজিদে উপস্থিত হবে। মনে করবে যেন কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে উপস্থিত হচ্ছে। কিয়ামতের কথা স্মরণ করে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে। নিজ পাপের জন্য ক্ষমা চাইবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ٱنظُرۡ كَيۡفَ فَضَّلۡنَا بَعۡضَهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۚ وَلَلۡأٓخِرَةُ أَكۡبَرُ دَرَجَٰتٖ وَأَكۡبَرُ تَفۡضِيلٗا ٢١﴾ [ الاسراء : ٢١ ]
“ভেবে দেখো, আমি তাদের কতককে কতকের ওপর কীভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। আর আখিরাত নিশ্চয়ই মর্যাদায় মহান এবং শ্রেষ্ঠত্বে বৃহত্তর। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২১]
আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিটি নি‘আমতে মুসলিমদের আনন্দিত হওয়া উচিত। রমযান মাস আল্লাহ প্রদত্ত নি‘আমতের মাঝে শীর্ষ পর্যায়ের একটি নি‘আমত। তাই এ রমযান প্রপ্তির কারণে তাদের খুশি হওয়া উচিত। আরো খুশি হওয়া উচিত, কারণ তারা রমযানের বদৌলতে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, সদকাসহ অন্যান্য ইবাদত করার সহজ সুযোগ পেয়েছে। এ খুশির পাশাপাশি আল্লাহর কৃতজ্ঞতাও জ্ঞাপন করা উচিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُلۡ بِفَضۡلِ ٱللَّهِ وَبِرَحۡمَتِهِۦ فَبِذَٰلِكَ فَلۡيَفۡرَحُواْ هُوَ خَيۡرٞ مِّمَّا يَجۡمَعُونَ ٥٨﴾ [ يونس : ٥٨ ]
“বলো, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে। সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা খুশি হয়। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৫৮]
রমযান মাস ছিল মুসলিমদের জন্য মহান আল্লাহর বড় একটি নি‘আমত। তাদের জন্য তাঁর দেওয়া বড় একটি সুযোগ। ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় সম্পাদিত দিনের সাওম ও রাতের সালাত ছিল কৃত গুনাহের কাফফারা ও ভবিষ্যতে পাপ থেকে মুক্ত থাকার প্রশিক্ষণস্বরূপ।