পরিচ্ছেদঃ ৩
একজন মুসলিমের চারিত্রিক গুণাবলি
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
সমস্ত প্রশংসা এককভাবে আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম তাঁর ওপর নাযিল হউক যার পর আর কোনো নবী নেই, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবীদের ওপর প্রতিদান দিবস পর্যন্ত সালাত ও সালাম নাযিল হউক।
শরী‘আত হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি যা সকল দিক থেকে সার্বিকভাবে মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবনকে গঠন করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে, এসব দিকের মধ্যে গুণাবলী শিষ্টাচার ও চরিত্রের দিকটি অন্যতম। ইসলাম এদিকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। তাইতো আক্বীদা ও আখলাকের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«أَكْمَلُ المُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا»
“মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানদার হচ্ছে সে ব্যক্তি যে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী”। [আহমাদ: ২/২৫০; আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪৬৮২; তিরমিযী, হাদীস নং ১১৬২।]
সুতরাং উত্তম চরিত্র হচ্ছে ঈমানের প্রমাণবাহী ও প্রতিফলন, চরিত্র ব্যতীত ঈমান প্রতিফলিত হয় না; বরং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, তাঁকে প্রেরণের অন্যতম মহান উদ্দেশ্য হচ্ছে চরিত্রের উত্তম দিকসমূহ পরিপূর্ণ করে দেওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ»
“আমি তো কেবল চরিত্রের উত্তম দিকসমূহ পরিপূর্ণ করে দিতে প্রেরিত হয়েছি”। ইমাম আহমাদ ও বুখারী আদাবুল মুফরাদে বর্ণনা করেছেন। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা উত্তম ও সুন্দরতম চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤﴾ [ القلم : ٤ ]
“এবং নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত”। [সূরা আল-ক্বালম, আয়াত: ৪]
কোথায় এটা বর্তমান বস্তুবাদী মতবাদ ও মানবতাবাদী মানুষের মনগড়া চিন্তা চেতনায়? যেখানে চরিত্রের দিককে সমপূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে, তা শুধু সুবিদাবাদী নীতিমালা ও বস্তুবাদী স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যদিও তা অন্যদের ওপর যুলুম বা নির্যাতনের মাধ্যমে হয়। অন্য সব জাতির সম্পদ লুন্ঠন ও মানুষের সম্মান হানীর মাধ্যমে হয়।
একজন মুসলিমের ওপর তার আচার-আচরণে আল্লাহর সাথে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে, অন্য মানুষের সাথে এমনকি নিজের সাথে কী করা ওয়াজিব, ইসলাম তার এক অভিনব চকমপ্রদ চিত্র অংকন করে দিয়েছে। যখনই একজন মুসলিম বাস্তবে ও তার লেনদেনে ইসলামী চরিত্রের অনুবর্তন করে তখনই সে অভিষ্ট পরিপূর্ণতার অতি নিকটে পৌঁছে যায়, যা তাকে আরো বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও উচ্চ মর্যাদার সোপানে উন্নীত হতে সহযোগিতা করে। পক্ষান্তরে, যখনই একজন মুসলিম ইসলামের চরিত্র ও শিষ্টাচার থেকে দূরে সরে যায় সে বাস্তবে ইসলামের প্রকৃত প্রাণ চাঞ্চল্য, নিয়ম-নীতির ভিত্তি থেকে দূরে সরে যায়, সে যান্ত্রিক মানুষের (রবোকব, রোবট) মতো হয়ে যায়, যার কোনো অনুভূতি এবং আত্মা নেই।
ইসলামে ইবাদতসমূহ চরিত্রের সাথে কঠোরভাবে সংযুক্ত। যে কোনো ইবাদতই একটি উত্তম চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায় না, তার কোনো মূল্য নেই। আল্লাহর সামনে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় সালাত একজন মানুষকে অশ্লীল অপছন্দ কাজসমূহ হতে রক্ষা করে, আত্মশুদ্ধি ও আত্মার উন্নতি সাধনে এর প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ تَنۡهَىٰ عَنِ ٱلۡفَحۡشَآءِ وَٱلۡمُنكَرِ﴾ [ العنكبوت : ٤٥ ]
“নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও অপছন্দনীয় কাজ থেকে নিষেধ করে”। [সূরা আল-আনকাবূত, আয়াত: ৪৫]
অনুরূপভাবে সাওম বা রোযা তাক্কওয়ার দিকে নিয়ে যায়। আর তাক্বওয়া হচ্ছে মহান চরিত্রের অন্যতম। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣﴾ [ البقرة : ١٨٣ ]
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সাওমকে ফরয করা হয়েছে যেমনি ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়া লাভ করতে পার”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৩]
সাওম অনুরূপভাবে শিষ্টাচার, ধীরস্থিরতা, প্রশান্তি, ক্ষমা, মুর্খদের থেকে বিমুখতা ইত্যাদির প্রতিফলন ঘটায়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ وَلاَ يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ، فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ»
“তোমাদের কারো সিয়ামের দিন যদি হয়, তাহলে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে, হৈ চৈ অস্থিরতা না করে, যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করে সে যেন বলে আমি সাওম পালনকারী”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৫১।]
যাকাতও অনুরূপভাবে অন্তরকে পবিত্র করে, আত্মাকে পরিমার্জিত করে এবং তাকে কৃপণতা, লোভ ও অহংকারের ব্যধী হতে মুক্ত করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا﴾ [ التوبة : ١٠٣ ]
“তাদের সম্পদ হতে আপনি সাদকাহ গ্রহণ করুন যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিমার্জিত করবেন”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০৩]
আর হজ হচ্ছে একটি বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণশালা আত্মশুদ্ধি এবং হিংসা বিদ্ধেষ ও পঙ্কিলতা থেকে আত্মাকে পরিশুদ্ধি ও পরিমার্জনের জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلۡحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي ٱلۡحَجِّۗ﴾ [ البقرة : ١٩٧ ]
“যে এ মাস গুলোতে নিজের ওপর হজ ফরয করে নিল সে যেন অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া বিবাদ হজের মধ্যে না করে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ، وَلَمْ يَفْسُقْ، رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ»
“যে ব্যক্তি অশ্লীল কথা-বার্তা ও পাপ কর্ম না করে হজ পালন করল সে তার পাপ রাশি হতে তার মা যেদিন জন্ম দিয়েছে সে দিনের মতো (নিষ্পাপ) হয়ে ফিরে এল”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫২১।]