পরিচ্ছেদঃ ৩
বিশ্ব নবীর বিশ্ব রহমত হওয়ার তাৎপর্য:
কোনো বস্তুর সঠিক মূল্যায়ন দুটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে হতে পারে। একটি তার পরিমিতি আর দ্বিতীয়টি তার অন্তর্নিহিত স্থান, বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কুরআনের উপরোদ্ধৃত ঘোষণা এ উভয় দিক দিয়েই বিবেচ্য। কেননা তাঁর মহান ব্যক্তিত্ব, উচ্চমানের শাশ্বত শিক্ষা ও আদর্শ মানব জীবনে এক বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সাধন করেছিল। নবতর দিকদর্শন ও কর্মতৎপরতার সূচনা করে দিয়েছিল। মানুষের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের যাবতীয় রোগের পূর্ণ নিরাময়তার কার্যকর ব্যাবস্থা করেছিল, মানব জীবনের সার্বিক সমস্যা ও জটিলতার চূড়ান্ত সমাধান দিয়েছিল; মানুষের সকল দুঃখ দুর্দশা, অভাব-অনটন, নির্যাতন-নিষ্পেষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়েছিল। মানুষের ওপর প্রকৃতভাবেই রহমত ও বরকতের ধারা ব্যাপকভাবে বর্ষিত হয়েছিল। তা যেমন পরিমিতির দিক দিয়ে অত্যন্ত বিরাট ও ব্যাপক, তেমনি সার্বিক কল্যাণ, বিশেষত্ব ও মানগত অবস্থার দিক দিয়েও তা ছিল তুলনাহীন-অসাধারণ।
‘রহমত’ শব্দটি সাধারণত কল্যাণ অর্থে ব্যবহৃত হয়। মানুষের যে কোনো প্রকারের কল্যাণই তার অন্তর্ভূক্ত। তার মাত্রা ও মানের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। কোনো বিশেষ ধরন বা রূপ নেই। তবে মানুষের সবচেয়ে বড় কল্যাণ হচ্ছে তাকে (মানুষকে) বাঁচতে দেওয়া, বাঁচার অধিকার ও উপকরণাদির ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শিশু যখন মরণোন্মুখ হয়, পিতা-মাতা সন্তানের অবস্থা দেখে আর্ত চিৎকারে আকাশ বাতাস ভারি করে, তখন আসে সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক। ব্যবস্থাপনা ও ঔষধ পথ্যাদির ব্যবহারে মূমুর্ষু শিশু আল্লাহর হুকুমে বেঁচে উঠে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন বিশ্বমানবতার জন্য অনুরূপ রহমত ছাড়া আর কিছুই নয়।
কেননা তিনি বিশ্ব মানবতাকে চূড়ান্ত ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছেন। রক্ষা করার সর্বাধিক কার্যকর পথ নির্দেশ ও জীবন-বিধান দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে একজন মানুষের মৃত্যু একটি ধ্বংস; কিন্তু তার চাইতেও বড় ধ্বংস হচ্ছে গোটা মানব সমষ্টির ধ্বংস। এ দু’টি ধ্বংসের মধ্যে যে পার্থক্য, তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। মহাসমুদ্র শুধু ব্যক্তিদেরকেই গ্রাস করে না; বরং অসংখ্য জাতি, জনবসতি, শহর-নগর গ্রামকেও গ্রাস করে নেয়। বহু সভ্যতা ও সংস্কৃতির পাদপীঠকে হজম করে ফেলে। এরূপ এক সর্বগ্রাসী মহাসমুদ্রের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় নির্ধারণ মানবসভ্যাতার জন্য এক তুলনাহীন অবদান, সন্দেহ নেই।
দুনিয়ার মানুষের মধ্যে যারা জ্ঞানের বিস্তার করেছেন, বিশ্বমানবতা তাদের প্রতি অবশ্যই চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু মানুষের যেসব জ্ঞানের দুশমন চতুর্দিকে ওঁৎ পেতে বসে আছে। যে কোনো মুহূর্তে হিংস্র শ্বাপদের মতো তাকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলতে পারে। সেসব থেকে মানুষকে রক্ষা করার ব্যবস্থা নিশ্চয় তার প্রতি সবচাইতে বড় অনুগ্রহ।
এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, এ বিশ্বলোকের একমাত্র স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক ও পরিচালক সম্পর্কে অজ্ঞতা, তাঁর মহান ও পবিত্র গুণাবলী ব্যাপারে অনবহিত এবং মানুষের ওপর তার অধিকার ও এখতিয়ার সম্পর্কে মূর্খতা সর্বগ্রাসী মহাসমুদ্রের তুলনায়ও অধিক ভয়াবহ। আর এই অজ্ঞতা ও মূর্খতার অনিবার্য পরিণতিতে শির্ক, কুসংস্কার ও প্রতিমা পূজার অবাঞ্চিত জঞ্জালের তলায় নিষ্পেষিত হতে থাকা বিশ্বমানবতার পক্ষে চরম অবমাননাকর। কেননা তা মনুষ্যত্বের অবমাননা যেমন, মানুষের উচ্চতর মদমর্যাদারও অপমান ঠিক তেমনই।
‘জড়’ ও জঠরের দাসত্ব, সীমালঙ্ঘন, মর্যাদাহীন এবং প্রবৃত্তির কামনা বাসনার নির্বিচার চরিতার্থতা মানুষকে নিতান্তই জন্তুতে পরিণত করে। আর মানবাকৃতির জন্তুগুলো সমগ্র সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়। অথচ মানুষের মনুষ্যত্বই যদি রক্ষিত না হয়, তাহলে মানব জন্মই একটা মস্ত বড় কলঙ্ক। এ কলঙ্ক শুধু মানব জাতির জন্য হয় না, হয় গোটা সৃষ্টিলোকের জন্য।
এই মহাসত্যকে সামনে রেখেই মহান সৃষ্টিকর্তা বিশ্বলোক ও মানবতার জন্য রহমতের অবারিত দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন ভূপৃষ্ঠের ওপর, প্রথম অবস্থিতি ও পদচারণার দিনই। সাধারণভাবে নবী রাসূল পাঠানো এবং বিশেষভাবে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপস্থিতি সেই অসীম রহমত ও কল্যাণ বিধানেরই ধারাবাহিকতা (সূচনায় রয়েছেন আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম) আর এ ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ‘কুঁড়ি’ হচ্ছেন শেষ দিন পর্যন্তকার জন্য আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ পর্যায়ে নদী পথে চলমান নৌকার মাঝি ও আরোহীদের কথপোকথনের বিখ্যাত উপকথাটি অবশ্যই স্মরণীয়।
১। নৌকারোহীরা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। মাঝি যখন পাল তুলে অনুকূল বাতাসে তীব্র গতিতে নৌকা চালিয়ে নিচ্ছিল, তখন আরোহীদের মন স্ফুর্তিতে নেচে উঠল। বৃদ্ধ মাঝিকে জিজ্ঞাসা করা হল: মাঝি ভাই, লেখাপড়া কিছু শিখেছ? বলল: তার আর সুযোগ পেলাম কোথায়? তাহলে অন্তত পদার্থ বিজ্ঞান তো নিশ্চয় পড়েছ? বলল: আমি তো তার নাম পর্যন্ত শুনি নি। আবার জিজ্ঞাসা করা হল: জ্যামিতি তো কিছু পড়েছই কিংবা ভূগোল বা ইতিহাস? সব জিজ্ঞাসার জবাবে মাঝি যখন বলল: বিদ্যার্জন তো দূরের কথা সে এ সবের নামও শুনে নি জীবনে। তখন সব কজন ছাত্র অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। একসঙ্গে সকলেই বলে উঠল: তাহলে তোমার জীবনটাই তো বৃথা। এমনি সময় প্রচণ্ড ঝড় উঠল, বাতাসে পাল ছিড়ে গেল। মাঝি জিজ্ঞাসা করল: বাবুরা সাঁতার জানেন তো? ছাত্ররা বলল: না। এবার মাঝি বলল: তাহলে আপনাদের সকলের গোটা জীবনটাই তো বৃথা।
বস্তুত বিশ্বমানবতার প্রতি নবী রাসূলগণের সবচাইতে বড় অবদান হচ্ছে- তাদেরকে অজ্ঞানতার কুল-কিনারহীন মহাসমুদ্রে ডুবে মরা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাঁতার কেটে বেঁচে থাকা ও সম্পূর্ণ নিরাপদে বেলা ভূমিতে পৌঁছে যাওয়ার উপযোগী জ্ঞান দান। সকল কালের মানবীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নবী-রাসূলগণ প্রদত্ত শিক্ষার মধ্যে এ পার্থক্যটাই বিদ্যমান। জীবনের মহাসমুদ্রে নিমজ্জমান অবস্থায় ভেসে থাকা ও সাঁতার কেটে কেটে কিনারায় পৌঁছে ধ্বংস থেকে বেঁচে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান মানুষ কেবলমাত্র তাদের মাধ্যমেই লাভ করেছে। আর সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামত পর্যন্তকার সর্বসাধারণ মানুষকে সেই মুক্তির শাশ্বত পথ দেখিয়ে গেছেন। এ কারণে তার নবুওয়াত ও রিসালাত চিরন্তন ও সার্বজনীন।
বিশ্বমানবতার ইতিহাস প্রমাণ করে, মানুষের নৈতিকতা ও চরিত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দরুন এবং মনুষ্যত্ব বিধ্বংসি কার্যাবলীর কারণে মানব সমাজের জীবন তরী যখনই নিমজ্জমান হচ্ছে, ঠিক তখনই নবী-রাসূলগণ এসে সেই তরীর হাল ধরেছেন শক্ত হাতে এবং পর্বত সমান উঁচু তরঙ্গমালার উপর দিয়ে ভাসিয়ে তাকে কিনারার দিকে নিয়ে গেছেন অত্যন্ত দক্ষতা সহকারে। এদিক দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবদান যেমন ব্যাপক, তেমনি গভীর ও অধিক সম্প্রসারিত। তাঁর প্রদত্ত শিক্ষা, সকল কালের, সকল বংশের, সকল দেশের ও বর্ণের মানুষের জন্যই সর্বাধিক কল্যাণবহ।
যেই সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছিলেন, সেই যুগটি ইতিহাসে ‘জাহিলিয়াতের যুগ’ বলে চিহ্নিত হয়েছে। এই যুগটি কেবল সামষ্টিক বা নৈতিক পতনের যুগই ছিল না, শুধু পৌত্তলিকা বা জুয়া খেলায় মত্ত হয়ে থাকার যুগই ছিল না, নিছক যুলুম ও স্বৈরতন্ত্রের যুগই ছিল না, অর্থনৈতিক শোষণ লুন্ঠনের যুগই ছিল না, নারীর অপমান নির্যাতন ও সদ্যজাত শিশু হত্যার যুগই ছিল না, এককথায় তা ছিল মনুষ্যত্ব ও মানবতার চরমতম অবমাননা ও দুর্দিনের যুগ, গোটা মানবতাকে চিরতরে সমাধিস্থ করার এক কঠিন কলঙ্কময় যুগ। মনুষ্যত্ব চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে যুগে এ দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَكُنتُمۡ عَلَىٰ شَفَا حُفۡرَةٖ مِّنَ ٱلنَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنۡهَاۗ﴾ [ ال عمران : ١٠٣ ]
“আর তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের কিনারায়। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]
এরূপ পরিস্থিতিতে বিশ্বনবীর আগমন সমাজে যে অবস্থার সৃষ্টি করেছিল, তা স্বয়ং তাঁরই একটি কথায় স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন,
“আমার আর তোমাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে সেই ব্যক্তির মত, যে আগুন জ্বালাল তখন চতুর্দিক আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উঠল আর পঙ্গপাল ও অন্যান্য পোকামাকড় তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল। আর সেই ব্যক্তি সেগুলোকে তা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু তা সত্বেও তারা এই বাধা লঙ্ঘন করে সেগুলো সেই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকল। তোমরা ধরে নিতে পার, আমিই সেই ব্যক্তি, যে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া লোকগুলোকে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু তোমরা তা মানছ না। তোমরা সেই আগুনে ঝাঁপ দিয়েই চলেছ। আর আমি তোমাদেরকে বলছি, আগুন থেকে সাবধান! আগুন থেকে সাবধান!” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
প্রকৃত অবস্থাও ছিল তাই। সেই সময় ও তার পরবর্তী কালের সমস্ত মানুষের জীবন তরীকে পূর্ণ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা সহকারে মুক্তি ও নিষ্কৃতির বেলাভূমে পৌঁছিয়ে দেওয়াই ছিল বিশ্বনবীর প্রধান কাজ।
সমস্ত মানুষকে মনুষ্যত্বের সুস্থ প্রকৃতিতে সুসংগঠিত ও উচ্চতর মর্যাদায় অধিষ্টিত করাই ছিল বিশ্বনবীর সাধনা। বস্তুত মানবতাই হচ্ছে নবী-রাসূলদের কর্মক্ষেত্র। তাঁরাই মানুষের উপর ঝুলে থাকা কঠিন বিপদের শানিত তরবারির নিচ থেকে তাদেরকে রক্ষা করেছেন, যা কোনো পরিকল্পিত জ্ঞান বিজ্ঞান করতে পারে নি। পারে নি কোনো বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। মানবাতিহাসে যখনই এমন অবস্থার উদ্ভব হয়েছে যে, মানুষ দুনিয়ায় বেঁচে থাকার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়ে গেছে, ঠিক তখনই নবী রাসূলগণ আগমন করে তাদেরকে সে অধিকার দিয়ে ধন্য করেছেন। তখন মানুষ শুধু বেঁচেই থাকেনি, বেঁচে থেকেছে পূর্ণ মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে। মানুষ যখন সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, তখনই নবী-রাসূলগণ তাদেরকে প্রকৃত লক্ষ্য চোখের সম্মুখে সমুদ্ভাসিত করে তুলেছেন এবং পূর্ণ মাত্রায় পরিচালিত করেছেন সেই লক্ষ্যের দিকে।
জাহিলিয়াতের যুগে মানুষের জীবন শুধু নিঃশেষিত হয় নি, তাদের দেহ পঁচে গলে অসহনীয় দুর্গন্ধে চতুর্দিক পঙ্কিল করে তুলেছিল। ঠিক এইরূপ কঠিন সময়ই সংগঠিত হয়েছিল বিশ্বনবীর মহান আগমন। আর তখনই আকাশ থেকে ঘোষিত হলো:
﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧ ﴾ [ الانبياء : ١٠٧ ]
“আর আমি তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭]