পরিচ্ছেদঃ ২০
মহাসাগরের গভীরের অন্ধকার
অধ্যাপক দুর্গা রাও একজন প্রখ্যাত সামুদ্রিক ভূতত্ত্ববিদ এবং জেদ্দার বাদশাহ আবদুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ছিলেন। তাঁকে কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের উপর মন্তব্য করতে বলা হয়।
اَوۡ کَظُلُمٰتٍ فِیۡ بَحۡرٍ لُّجِّیٍّ یَّغۡشٰہُ مَوۡجٌ مِّنۡ فَوۡقِہٖ مَوۡجٌ مِّنۡ فَوۡقِہٖ سَحَابٌ ؕ ظُلُمٰتٌۢ بَعۡضُہَا فَوۡقَ بَعۡضٍ ؕ اِذَاۤ اَخۡرَجَ یَدَہٗ لَمۡ یَکَدۡ یَرٰىہَا ؕ وَ مَنۡ لَّمۡ یَجۡعَلِ اللّٰہُ لَہٗ نُوۡرًا فَمَا لَہٗ مِنۡ نُّوۡرٍ
‘অথবা (তাদের কর্ম) প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার উপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের উপর এক অন্ধকার। যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না, তার কোন জ্যোতি নেই। -সূরা আন নূর-৪০
অধ্যাপক রায় বলেন, বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি মাত্র আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে মহাসাগরের গভীরের অন্ধকার সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছে। মানুষ বিনা সাহায্যে পানির ২০-৩০ মিটার নীচে ডুব দিতে পারেনা এবং সাগরের ২০০ মিটারের অধিক নীচের অঞ্চলে বাঁচতেও পারেনা। এ আয়াতে সকল সাগরের কথা বলা হয়নি। কেননা, সকল সাগরের নীচে অন্ধকারের স্তর নেই। আয়াতে কেবল গভীর সাগর বা মহাসাগরের কথাই বলা হয়েছে। কেননা আল্লাই উক্ত আয়াতে বলেছেন, ‘গভীর সাগরের অন্ধকার’। দু’টো কারণে গভীর মহাসাগরে স্তরবিশিষ্ট অন্ধকার দেখতে পাওয়া যায়।
১। আলোক রশ্মির সাতটি রং রংধনুতে দেখতে পাওয়া যায়। সে রংগুলো হল, বেগুনী, নীল, নীলাভ, সবুজ, হলুদ, কমলা এবং লাল। আলোক রশ্মি পানিতে পড়লে তা ভেঙ্গে যায়। পানি উপরিভাগের ১০-১৫ মিটার পর্যন্ত লাল রং ধারণ করতে পারে। কোন ডুবুরী পানির ২৫ মিটার নীচে ডুব দিয়ে আহত হলে, নিজের রক্তের লাল রং দেখতে পাবেনা। কেননা, লাল রং ঐ গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছায় না। অনুরূপভাবে কমলা রং পানির ৩০-৫০ মিটার নীচ পর্যন্ত পৌঁছে, হলুদ রং ৫০-১০০ মিটার, সবুজ রং ১০০-২০০ মিটার, নীল রং ২০০ মিটার এবং বেগুনী ও নীলাভ রং ২০০ মিটার গভীর পর্যন্ত পৌঁছে। যেহেতু বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রং দেখা যায় না, ফলে মহাসাগর অন্ধকার হয়। অর্থাৎ আলোর স্তরসমূহে অন্ধকার স্থান দখল করে। পানির ১০০০ মিটার নীচে সম্পূর্ণ অন্ধকার।[১]
──────────────────[১] Ocesns, Elder & Pernetta, p27
২। মেঘ সূর্যরশ্মিকে ধারণ করে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। ফলে মেঘের নীচে অন্ধকারের ১টি স্তর সৃষ্টি হয়। এটাই হল, অন্ধকারের ১ম স্তর। সূর্যের আলো মহাসাগরের উপরে পড়লে তা ঢেউয়ের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। তখন একে আলোকোজ্জল মনে হয়। ঢেউ আলোর প্রতিফলন ঘটায় এবং অন্ধকার সৃষ্টি করে। অপ্রতিফলিত আলোক রশ্মি মহাসাগরের গভীরে প্রবেশ করে। ফলে মহাসাগরের মধ্যে দুটো ভাগ দেখতে পাওয়া যায়। উপরের ভাগে আছে আলো ও উষ্ণতা এবং গভীরে রয়েছে অন্ধকার। উপরের অংশটি ঢেউয়ের কারণে গভীর সমুদ্র থেকে ভিন্ন ধরনের।
আভ্যন্তরীন ঢেউয়ের মধ্যে সাগর ও মহাসাগরের গভীর পানিও শামিল আছে। কারণ, তখন উপরের পানি অপেক্ষা নীচের পানির ঘনত্ব বেশী থাকে।
আভ্যন্তরীন ঢেউয়ের নীচে অন্ধকার শুরু হয়। এমন মহাসাগরের গভীরে অবস্থানকারী মাছগুলোও তখন দেখতে পায়না। তাদের আলোর একমাত্র উৎস হল, নিজেদের শরীরের আলো।
কোরআন এর যথার্থ বর্ণনা পেশ করে বলেছেঃ “প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ।”
অন্য কথায়, এ সকল ঢেউয়ের উপর আরো বিভিন্ন প্রকারের ঢেউ আছে যা মহাসাগরের উপরিভাগে দেখতে পাওয়া যায়। কোরআনের আয়াতে বলা হয়েছেঃ যার উপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের উপর এক ঘন অন্ধকার।’
উল্লেখিত মেঘমালা একটার উপর আরেকটা আড়াল হিসেবে কাজ করায় এবং বিভিন্ন স্তরে রং ধারণ করায় অন্ধকারের মাত্রা বা ঘনত্ব আরো বেড়ে যায়।
অধ্যাপক দুর্গা রাও এ বলে সমাপ্তি টানেন যে, ১৪০০ বছর আগে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এ অবস্থার এত বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সুতরাং এ সকল তথ্য যে ঐশী উৎস থেকে এসেছে, তা পরিষ্কার। আল্লাহ বলেনঃ
وَ ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ مِنَ الۡمَآءِ بَشَرًا فَجَعَلَہٗ نَسَبًا وَّ صِہۡرًا ؕ وَ کَانَ رَبُّکَ قَدِیۡرًا
“তিনিই পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন মানবকে, অতঃপর তাকে রক্তগত বংশ ও বৈবাহিক সম্পর্কশীল করেছেন। তোমার পালনকর্তা সবকিছু করতে সক্ষম।” -সূরা আল ফুরকান-৫৪।
আজ থেকে ১৪শ বছর আগে কারো পক্ষে কি একথা চিন্তা করা সম্ভব ছিল যে, সকল প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে? বিশেষ করে আরব মরুতে যেখানে সর্বদাই পানির স্বল্পতা রয়েছে, সেখানকার কোন ব্যক্তির পক্ষে কি এ জাতীয় ধারণা করা সম্ভব?