পরিচ্ছেদঃ ৫৭
৫৪. মৃত্যু ব্যক্তির পক্ষ থেকে সাওম পালন করা
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ مَاتَ وعَلَيهِ صِيامٌ صَامَ عَنْهُ وليُّهُ» .
“যে মারা গেল, অথচ তার সিয়াম রয়েছে, তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে সাওম রাখবে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৪৭।]
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,
«جَاءَ رَجُلٌ إلى النَّبيِّ صلى الله عليه وسلم فَقالَ : يا رَسولَ الله، إن أُمِّي ماتَتْ وعَليها صَومُ شَهْرٍ، أَفَأَقْضِيهِ عَنْهَا؟ فَقالَ عَليهِ الصَّلاة والسَّلام : لَوْ كانَ على أُمِّكَ دينٌ أَكُنْتَ قَاضِيْهِ عَنها؟ قالَ : نعم، قال : فَدَينُ الله أَحَقُّ أَنْ يُقضَى» .
“এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসল, অতঃপর সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমার মা মারা গেছে, তার জিম্মায় এক মাসের সাওম রয়েছে, আমি কি তার পক্ষ থেকে কাযা করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যদি তোমার মায়ের ওপর ঋণ থাকে, তার পক্ষ থেকে তুমি কি তা আদায় করবে? সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: অতএব আল্লাহর ঋণ বেশি হকদার, যা কাযা করা উচিৎ”। [সহীহ বুখারী ও মুসলিম।]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অপর বর্ণনায় আছে:
«أنَّ امرأةً جاءَتْ إلى النَّبيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالتْ : يا رَسُولَ الله، إنَّ أُمِّي مَاتَتْ وعَلَيْهَا صَوْمُ نَذْرٍ أَفَأَصُومُ عَنْهَا؟ قالَ : أرَأَيتِ لَوْ كَانَ عَلَى أُمُّكِ دَيْنٌ فَقَضَيتِهِ أَكَانَ يُؤْدِي ذلكَ عنها؟ قالت : نعَم، قالَ : فَصُومِي عَنْ أُمِّكِ» .
“জনৈক নারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমার মা মারা গেছে, তার ওপর মান্নতের সাওম রয়েছে, আমি কি তার পক্ষ থেকে সাওম রাখব? তিনি বললেন: তুমি কি মনে কর, তোমার মার ওপর যদি ঋণ থাকে, আর তুমি তা আদায় কর, তাহলে কি যথেষ্ট হবে? সে বলল: হ্যাঁ, তিনি বললেন: তোমার মায়ের পক্ষ থেকে তুমি সাওম রাখ”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৪৮। উভয় হাদীসের শব্দ মুসলিম থেকে নেওয়া। ইমাম আহমদের বর্ণনায় আছে: “আমার মা মারা গেছে, তার জিম্মায় রমযানের এক মাস রোযা রয়েছে, আমি তার পক্ষ থেকে তা কি কাযা করব? তিনি বললেন: তুমি কি লক্ষ্য করছ, যদি তার উপর ঋণ থাকত তুমি তা পরিশোধ করতে? সে বলল: হ্যাঁ, তিনি বললেন: অতএব আল্লাহর ঋণ কাযার বেশী দাবি রাখে”। মুসনাদে আহমদ: (১/৩৬২), শাইখ আহমদ শাকের হাদীসটি সহীহ বলেছেন: (৩৪২০), অতঃপর তিনি বলেছেন: “এ হাদীস স্পষ্ট করে যে, রমযানের কাযা সম্পর্কে প্রশ্ন ছিল, কিন্তু হাফেয এ কথা বলেননি, আরো স্পষ্ট যে প্রশ্ন করার ঘটনা কয়েকবার ঘটেছে, একবার মানত সম্পর্কে, একবার রমযান সম্পর্কে, প্রশ্নকারী কখনো ছিল পরুষ, কখনো ছিল নারী”।আমি (লেখক) বলি: শাইখ শুআইব আরনাউতের তত্ত্বাবধানে মুসনাদে আহমদের যারা তাহকিক করেছেন, তাদের নিকট এ অতিরিক্ত ভুল, অর্থাৎ “রমযান মাস”, যদিও হাতে লেখা কতক মৌলিক কপিতে তা এসেছে, যার ভিত্তিতে তারা মুসনাদের তাহকিক করেছেন। কারণ, এসব মৌলিক কপির বর্ধিত অংশ “আতরাফে মুসনাদ” ও “ইতহাফে মাহারাতে” বিদ্যমান হাদীসের বিপরীত, তারা এ বর্ধিত অংশ ব্যতীত হাদীসকে সহীহ বলেছেন: (৩৪২০), এ বর্ধিত অংশের উপর নির্ভর করেছেন শাইখ ইবন বায তার কতক দরসে। স্পষ্ট যে তিনি এ বর্ধিত অংশকে সহীহ মনে করেছেন। যাই হোক হাদীসের ব্যাপকতা রমযানকে শামিল করে, বিশুদ্ধ অভিমত অনুযায়ী মানতের সাথে খাস নয়। অতঃপর আমি হাফেয ইবন হাজারের “ইতহাফে মাহারাহ” দেখি, যা জামেয়া ইসলামিয়াহ মদিনার সংরক্ষিত কপি, সেখানে আমি হাদীসটি দেখি বর্ধিত অংশ ব্যতীত, হাফেয যার তাখরিজ করেছেন ইবন খুযাইমাহ, আবু আওয়ানাহ, ইবন হিব্বান ও দারা কুতনি থেকে: (৭/১০১), হাদীস নং ৭৪১৯, এসব থেকে প্রমাণিত হয় বর্ধিত অংশ হাদীসে অনুপ্রবেশ করেছে, মূল হাদীসের অংশ নয়। আল্লাহ ভালো জানেন।]
বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«بينَا أنَا جَالسٌ عندَ رَسولِ الله صلى الله عليه وسلم إذ أتَتْهُ امرأةٌ فقالتْ : إنِّي تَصَدَّقْتُ على أمِّي بجَاريةٍ وإنها ماتتْ . قالَ : فقالَ : وجَبَ أَجرُكِ وردَّها عليكِ الميراث، قالتْ : يا رسولَ الله، إنَّه كانَ عليها صومُ شَهرٍ أفَأَصُومُ عنها؟ قال : صُومِي عنهَا، قالتْ : إنَّها لمْ تَحُجَّ قَطُ، أفَأَحُجُّ عنهَا؟ قال : حُجِّي عنها» .
“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসে ছিলাম, ইত্যবসরে তার নিকট এক নারী এসে বলল: আমি আমার মাকে এক “দাসী” সদকা করেছি, কিন্তু সে মারা গেছে।
বর্ণনাকারী বলেন, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমার সাওয়াব হয়ে গেছে, তুমি তা মিরাস হিসেবে ফিরিয়ে নাও। সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, তার জিম্মায় একমাসের সাওম ছিল, আমি কি তার পক্ষ থেকে সাওম রাখব? তিনি বললেন: তার পক্ষ থেকে সাওম রাখ। সে বলল: তিনি কখনো হজ করেননি, আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ করব? তিনি বললেন: তার পক্ষ থেকে হজ কর”। [মুসলিম, হাদীস নং ১১৪৯; আবু দাউদ, হাদীস নং ২৮৭৭; তিরমিযী, হাদীস নং ৬৬৭; নাসাঈ ফিল কুবরা, হাদীস নং ৬৩১৪; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৩৯৪।]
শিক্ষা ও মাসায়েল:
এক. শারীরিক ইবাদতে প্রতিনিধিত্ব হয় না এটাই মূলনীতি, তবে সিয়াম এ নীতির অন্তর্ভুক্ত নয়, যেমন নয় হজ। হাফেয ইবন আব্দুল বার রহ: বলেছেন: “সালাতের ব্যাপারে সবাই একমত যে, কেউ কারো পক্ষ থেকে সালাত আদায় করবে না, না ফরয, না সুন্নাত, না নফল, না জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে, না মৃত ব্যক্তির। অনুরূপ জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সিয়াম, জীবিতাবস্থায় একের সাওম অপরের পক্ষ থেকে আদায় হবেনা। এতে ইজমা রয়েছে, কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু যে মারা যায়, তার জিম্মায় যদি সিয়াম থাকে, তার ব্যাপারে পূর্বাপর আলিমদের ইখতিলাফ রয়েছে”। [আল-ইস্তেযকার: (৪/৩৪০), এ বিষয়ে ইজমা নকল করেছেন কাদি আয়াদ ফি ইকমালিল মুয়াল্লিম: (৪/৪০৪) ও কুরতুবি ফিল মুফহিম: (৩/২০৮-২০৯)।]
দুই. মৃত ব্যক্তির জিম্মায় যদি সিয়াম থাকে, তার দুই অবস্থা:
এক. কাযার সুযোগ না পেয়ে মারা যাওয়া, সময়ের সংকীর্ণতা অথবা অসুস্থতা অথবা সফর অথবা সাওমের অক্ষমতার দরুন কাযার সুযোগ পায়নি, অধিকাংশ আলিমদের মতে তার ওপর কিছু নেই।
দুই. কাযার সুযোগ পেয়ে মারা যাওয়া, এ ক্ষেত্রে সুন্নাত হচ্ছে তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে সাওম রাখবে।
তিন. মৃত ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করা বৈধ, আত্মীয়-স্বজন বা অন্য কারো পক্ষ থেকে। হাদীসে বর্ণিত «صَامَ عَنْهُ وليُّهُ» অর্থ হচ্ছে ওয়ারিশ ও উত্তরসূরী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন হয়, অন্যথায় তার পক্ষ থেকে তার নিকট আত্মীয় অথবা দূরের কারো সিয়াম পালন করা বৈধ, ঋণ আদায়ের ন্যায়। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ রহ. বলেছেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা ঋণের সাথে তুলনা করেছেন, ঋণ যে কেউ কাযা করতে পারে। অতএব, প্রমাণিত হয় যে, এটা যে কারো পক্ষ থেকে করা বৈধ, শুধু সন্তানের সাথে খাস নয়। [মাজমুউল ফাতাওয়া: (২৪/৩১১); দেখুন: আল-মুগনি: (৪/৪০০); ফাতহুল বারি: (৪/১৯৪); শারহুল মুমতি: (৬/৪৫২)।]
চার. মৃত্যু ব্যক্তির মানত কাযা করা ওয়াজিব নয়, যেমন নয় অভিভাবকদের ওপর তার ঋণ পরিশোধ করা, তবে এটা মৃত ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করার জন্য তাদের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ। [দেখুন: আল-মুগনি: (৪/৩৯৯-৪০০); শারহুল মুমতি: (৬/৪৫০)। ওয়াজিব না হওয়ার কারণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰ﴾ [ الانعام : ١٦٤ ] “আর কোনো ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৬৪], দ্বিতীয়ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার তুলনা করেছেন ঋণের সাথে, আর ঋণ পরিশোধ করা অভিভাবদের ওয়াজিব নয়।]
পাঁচ. মৃতের জিম্মায় যদি অনেক সিয়াম থাকে, সে সংখ্যানুসারে তার পক্ষ থেকে কতক লোক যদি একদিন সিয়াম পালন করে, তাহলে শুদ্ধ হবে, তবে যে সাওমে ধারাবাহিকতা জরুরি তা ব্যতীত, যেমন যিহার ও হত্যার কাফ্ফারা, এ ক্ষেত্রে একজন ধারাবাহিকভাবে সিয়াম পালন করবে। [বুখারী হাসানের বাণী টিকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন: “যদি একদিন ত্রিশ ব্যক্তি সিয়াম পালন করে, বৈধ হবে”: (২/৬৯০), দারাকুতনি তা পূর্ণ সনদে উল্লেখ করেছেন, যেমন হাফেয ইবন হাজার উল্লেখ করেছেন: (৪/১৯৩), দেখুন: শারহুল মুমতি: (৬/৩৫২-৩৫৩), শাইখ ইবন বায রহ. অনুরূপ বলেছেন। কারণ, এ ব্যাপারে হাদীসগুলো ব্যাপক। তিনি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাফ্ফারার সিয়াম সম্পর্কে বলেন: “এ সিয়াম এক গ্রুপের ওপর ভাগ করে দেওয়া বৈধ নয়, বরং এগুলো এক ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে পালন করব। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা অনুমোদন করেছেন”। মাজমু ফাতাওয়া ইবন বায: (১৫/৩৭৫)।]
ছয়. যদি তার পক্ষ থেকে কেউ সিয়াম পালন না করে, তবে তার অভিভাবকগণ তার পক্ষ থেকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্য দিবে, তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে দেওয়া বৈধ। [শারহুল মুমতি: (৬/৪৫৬)।]
সাত. ওয়ারিশগণ যদি কাউকে সাওমের জন্য ভাড়া করে, তাহলে শুদ্ধ হবে না। কারণ, নেকির বিষয়ে ভাড়া করা বৈধ নয়। [শারহুল মুমতি: (৬/৪৫৬), এ মাসআলাকে বদলি হজের ওপর কিয়াস করা যাবে না। যেমন, বর্তমান যুগে কতক লোক করে থাকে যে, তাদের অভিভাবকের পক্ষ থেকে যে হজ করবে তাকে তারা টাকা দেয়, যা তার হজ পর্যন্ত সফর খরচ, কিন্তু সে কম খরচ করে ও তা থেকে কিছু বাচিয়ে রাখে। এ জন্য আলিমগণ এমন লোককে হজে পাঠাতে নিষেধ করেছেন, যার উদ্দেশ্য শুধু অর্থ উপার্জন।]
আট. যদি মানত করে মুহাররাম মাসে সিয়াম পালন করবে, অতঃপর সে যিলহজ মাসে মারা যায়, তার পক্ষ থেকে কাযা করা হবে না, কারণ, সে ওয়াজিব হওয়ার সময় পায় নি, যেমন কেউ মারা গেল রমযানের পূর্বে। [শারহুল মুমতি: (৬/৪৫৬)।]
নয়. যার ওপর রমযানের কতক দিনের সিয়াম ওয়াজিব, সে যদি তার নিকট আত্মীয়ের কাযা অথবা কাফ্ফারা অথবা মান্নতের সাওম পালন করতে চায়, তার ওপর ওয়াজিব আগে নিজের সাওম পালন করা, অতঃপর তার নিকট আত্মীয়ের সাওম পালন করা। [ফাতাওয়া লাজনায়ে দায়েমাহ: (৭৯৪২)।]
দশ. বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী কাযা সাওমে ধারাবাহিকতা শর্ত নয়, তবে ধারাবাহিকভাবে কাযা করা উত্তম। কারণ, তার সাথে আদায়ের মিল থাকে। [ফাতাওয়া ইবন জাবরিন: (১২৫)।]
এগার. কাফ্ফারার দু’মাস সিয়ামের ধারাবাহিকতা ঈদের দিনের কারণে ভঙ্গ হবে না। [ফাতাওয়া ইবন জাবরিন: (১০২)।]