পরিচ্ছেদঃ ৪
দ্বিতীয়ত: নবী মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ করা তাঁর ওপর ঈমান আনয়নের বাস্তব প্রমাণ। সুতরাং যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও তাঁকে মহব্বত করার (ভালোবাসার) দাবি করল, অতঃপর সে তাঁর নির্দেশের অনুসরণ করলা না এবং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা থেকে নিষেধ করেছেন এমন হারাম থেকে বিরত থাকল না, আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সুন্নাতের অনুসরণ করল না, সে ব্যক্তি তার ঈমান আনয়ন করার দাবিতে মিথ্যাবাদী। কারণ, ঈমান হলো এমন এক বিষয়, যা অন্তরের মধ্যে স্থিরভাবে অবস্থান করে এবং আমল তাকে সত্য ও বাস্তবে পরিণত করে।
আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণকারী ও অনুগত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ তাঁর (আল্লাহর) রহমত লাভ করতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَرَحۡمَتِي وَسِعَتۡ كُلَّ شَيۡءٖۚ فَسَأَكۡتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱلَّذِينَ هُم بَِٔايَٰتِنَا يُؤۡمِنُونَ ١٥٦ ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِيَّ ٱلۡأُمِّيَّ﴾ [ الاعراف : ١٥٦، ١٥٧ ]
“আর আমার দয়া তা তো প্রত্যেক বস্তুকে ঘিরে রয়েছে। কাজেই আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত দেয় ও আমাদের আয়াতসমূহে ঈমান আনে, যারা অনুসরণ করে রাসূলের, উম্মী (নিরক্ষর) নবীর।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৬–১৫৭]
আর আল্লাহ তা‘আলা ঈমান আনয়ন ও আনুগত্য করা -এ দু’টি বিষয়কে একত্রিত করে দিয়েছেন এবং তাকে হিদায়াত ও সফলতার অন্যতম উপায় বানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তিনি বলেন:
﴿ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِيَّ ٱلۡأُمِّيَّ ٱلَّذِي يَجِدُونَهُۥ مَكۡتُوبًا عِندَهُمۡ فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَٱلۡإِنجِيلِ يَأۡمُرُهُم بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَىٰهُمۡ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡخَبَٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنۡهُمۡ إِصۡرَهُمۡ وَٱلۡأَغۡلَٰلَ ٱلَّتِي كَانَتۡ عَلَيۡهِمۡۚ فَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُواْ ٱلنُّورَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٥٧﴾ [ الاعراف : ١٥٧ ]
“যারা অনুসরণ করে রাসূলের, উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়, যিনি তাদেরকে সৎকাজের আদেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন। আর তাদেরকে তাদের গুরুভার ও শৃংখল হতে মুক্ত করেন যা তাদের ওপর ছিল। কাজেই যারা তার ওপর ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তার সাথে নাযিল হয়েছে সেটার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৭]
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াত থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তাঁর নির্দেশের বিরোধিতা করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। সুতরাং তিনি বলেন:
﴿فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ ٦٣﴾ [ النور : ٦٣ ]
“কাজেই যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের ওপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬৩]
আর আল্লাহ তা‘আলা ঝগড়া-বিবাদ ও মতানৈক্যের সময় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা মূলত আল্লাহরই ফয়সালা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের খেয়াল খুশি মত কোনো কথা বলতেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ﴾ [ النساء : ٥٩ ]
“অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৯]
আর তাঁর বিচারের প্রতি মনের ঘৃণা নিয়ে তাঁর নিকট বিচারের আবেদন করলেও যথেষ্ট হবে না; বরং আবশ্যক হলো তাঁর বিচারের প্রতি মনের উদারতা প্রদর্শন করে এবং তাঁর নির্দেশকে এমনভাবে মেনে নেওয়া, যেখানে কোনো প্রকার আপত্তি থাকবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥﴾ [ النساء : ٦٥ ]
“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার ওপর অর্পণ না করে। অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৫]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন: “আল্লাহ তা‘আলা শপথ করার শ্রেষ্ঠ বিষয় দ্বারা এখানে শপথ করেছেন, আর তা হলো তিনি স্বয়ং নিজেই নিজের নামে শপথ করেছেন, আর শপথের প্রাসঙ্গিক বিষয়টি হলো তাদের জন্য ঈমান সাব্যস্ত হবে না এবং তারা ঈমানদার বলেও গণ্য হবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয়ে/দীনের সার্বিক বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করবে। শুধু এটাই নয়, (বরং তারা মুমিন হতে পারবে না) যতক্ষণ না এর সাথে সংযুক্ত হবে তাঁর বিচার-মীমাংসার প্রতি তাদের উদার মন-মানসিকতা, যেখানে তারা তাদের মনে তাঁর বিচার-ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের প্রশ্নে কোনো প্রকার সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা অনুভব করবে না; বরং তাঁর বিচার-মীমাংসাকে উদার চিত্তে গ্রহণ করে নিবে এবং তাকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে স্বাগত জানাবে।” অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ করার বিষয়টির সাথে অবশ্যই সংযুক্ত থাকতে হবে তাঁর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের) প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মহব্বত; আর এটা হলো উম্মতের উপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকারসমূহ থেকে তৃতীয় অধিকার।