পরিচ্ছেদঃ ১৮
সুস্থ থাকার নিয়মাবলী
‘‘শরীর তোমার ভাবনাও তোমার’’।
‘‘তোমার স্বাস্থ্য তোমার হাতে’’।
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে তার স্বাস্থ্য। বলা হয়, ‘‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’’। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে কোনোকিছুই ভালো লাগে না। মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করতে হলে অবশ্যই শরীরটা সুস্থ রাখতে হবে। মানবদেহ একটি যন্ত্রবিশেষ- যা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চালু থাকে। বিভিন্ন যন্ত্রপাতিকে সচল রাখার জন্য যেমন যত্ন নিতে হয় তেমনি শরীরেরও যত্ন নিতে হয়। এজন্য সবসময় কিছু নিয়মকানুন মেনে চলা উচিত, যাতে সহজে কোনো শারীরিক সমস্যা না হয়। শরীর সুস্থ রাখতে হলে যে কয়টি জিনিসের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে তা হল- খাদ্য, পানীয়, বিশ্রাম, ঘুম, আলো-বাতাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, গোসল, সংযম ও শারীরিক পরিশ্রম অথবা ব্যায়াম। এসব দিকে নজর দেয়ার পরও যদি কোনো রোগ দেখা দেয় তবে গাছ-গাছড়া ব্যবহার করা উচিত। আর রোগ যদি জটিল হয় তবে অবশ্যই তাড়াতাড়ি ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।
সুস্থ থাকার জন্য যেসব নিয়ম পালন করা কর্তব্য তা হল :
পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি খেতে হবে। পানি ছাড়া জীব বাঁচে না। সবসময় বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত। টিউবওয়েলের পানি পান করা ভালো। তবে সবচেয়ে ভালো পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করা।
মুক্ত বায়ু ছাড়া শরীর সুস্থ থাকে না। তাই যে ঘরে মুক্ত বায়ু থাকে সেই ঘরে বাস করা উচিত।
প্রতিদিন কিছুক্ষণ রোদে থাকা শরীরের জন্য ভালো।
প্রত্যেক সুস্থ মানুষের ৫ থেকে ৭ ঘন্টা ঘুমানো উচিত। তবে একমাত্র রোগী ও শিশু ছাড়া কারও দিনে ঘুমানো অনুচিত।
মলমূত্র আটকে রাখা এবং হঠাৎ গরম থেকে ঠান্ডায় যাওয়া এবং ঠান্ডা থেকে গরমে আসা অনুচিত। এতে স্বাস্থ্যহানি হয়।
খাদ্য নির্বাচন
বয়সের হিসাব মতে এবং শরীরের গ্রহণীয় ক্ষমতা, হজমশক্তি ও রুচি অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করতে হবে।
পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিকর খাদ্য ও যতটা সম্ভব সহজে হজম হয় এমন খাদ্য খাওয়া উচিত।
রোগ প্রতিরোধ করতে পারে এমনসব খাবার খাওয়া উচিত। চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম চিকিৎসা।
তরিতরকারী ও ফলমূল সবসময় ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে।
রাস্তা-ঘাটের খোলামেলা জিনিষ, পঁচা-বাসি জিনিষ খাওয়া ঠিক নয়।
ধুমপান, মাদকদ্রব্য ও সকল প্রকার ক্ষতিকর জিনিস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
হালাল খাবার খেতে হবে :
শরীর সুস্থ রাখার জন্য যে খাবার খাওয়া হয় তার প্রথম শর্তই হচ্ছে হালাল ও পবিত্র জিনিস খাওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,
يَا اَيُّهَا النَّاسُ كُلُوْا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوْا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ اِنَّهٗ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِيْنٌ
‘‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র বস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা খাও এবং শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’’ (সূরা বাকারা- ১৬৮)
মনে রাখতে হবে, হালাল খাবার শুধু দেহের ক্ষুদাই নিবারণ করে না; বরং অন্তরে প্রশান্তি আনয়ন করে।
পরিমিত আহার করতে হবে :
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট পরিমাণে আহার করতে হবে। এটি এমন একটি ভালো অভ্যাস, যে ব্যক্তি তা পালন করে সে নানা অসুখ থেকে নিরাপদ থাকে, তার স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং অলসতা সৃষ্টি হয় না। মাত্রাতিরিক্ত খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا اِنَّهٗ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِيْنَ
‘‘তোমরা খাও এবং পান করো; কিমুত অপচয় করো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’’ (সূরা আরাফ- ৩১)
উমর (রাঃ) বলেন, ‘‘যুবক যদি তিনটি অঙ্গের হেফাযত করতে পারে তবে সে যৌবনের সকল ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবে। (১) মুখ (২) লজ্জাস্থান (৩) পেট, অর্থাৎ হারাম ও মাত্রাতিরিক্ত খাবে না।’’
জ্ঞানের জন্য তিনটি জিনিস উপকারী :
(১) পরিমিত আহার করা, (২) পরিমিত ঘুমানো, (৩) কম কথা বলা।
খাদ্যের প্রকারভেদ
বিজ্ঞানীরা খাদ্যকে ছয় প্রকার বলে বর্ণনা করেছেন :
১। প্রোটিন জাতীয় খাদ্য : এ জাতীয় খাদ্য দেহের ক্ষয় পূরণ করে এবং পুষ্টি যোগায়। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ছানা ও ডাল প্রোটিন জাতীয় খাদ্য।
২। চর্বি জাতীয় খাদ্য : এ জাতীয় খাদ্য শরীরের মেদ, কর্মক্ষমতা ও উষ্ণতা তৈরি করে। চর্বি, ঘি, মাখন, তেল ও বাদাম চর্বি জাতীয় খাদ্য।
৩। শর্করা জাতীয় খাদ্য : এ জাতীয় খাদ্য দেহের শক্তি, তাপ ও মেদ তৈরি করে। ভাত, রুটি, চিরা, আলু, চিনি ও খেজুর শর্করা জাতীয় খাদ্য।
৪। পানি : পানির অপর নাম জীবন। খাবার হজম করা থেকে শুরু করে দেহের সব কাজে সাহায্য করা এবং শরীরের অস্বাস্থ্যকর পদার্থ বের করে দেয়ার জন্য পানি খুবই প্রয়োজন।
৫। লবণ : শরীরের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান হল লবণ। সাধারণ লবণ ছাড়াও ফলমূল, শাকসবজী, চুন, সোডা ও পটাশ প্রভৃতিতে লবণ রয়েছে।
৬। ভিটামিন : এসব উপাদান ছাড়াও শরীরের আরো একটি প্রয়োজনীয় উপাদান হল ভিটামিন। ভিটামিনের অভাব হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। তাই এর নাম ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ।
নিচে ভিটামিন সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা হল :
ভিটামিনের প্রকারভেদ ও উপাদানসমূহ
(১) ভিটামিন- ‘এ’ : এ ভিটামিনের অভাব দেখা দিলে রাতকানা, চোখ ও কানের রোগ, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, মূত্রপাথরী প্রভৃতি রোগ হয়ে থাকে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। পালংশাক, টমেটো, লাল আলু, গাজর, মটরশুটি, বাধাকপি, পেপে, লাউ, পাকা আম, সবুজ ও হলুদ রঙ্গের শাকসবজী, পল, দুধ, মাখন, ডিম, মাছের তেল ও খাসির চর্বিতে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ থাকে।
(২) ভিটামিন- ‘বি’ : এ ভিটামিনের অভাব দেখা দিলে অজীর্ণ, অক্ষুধা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মুখে ও জিভে ঘা, বেরিবেরি, শিশুদের ওজন কমা, শীর্ণতা ও স্তনে দুধের অভাব দেখা দেয়। ভুট্টা, ছোলা, যবের ছাতু, ডাল, কড়াইশুটি, বিভিন্ন প্রকারের সবুজ সবজি, বাধাকপি, পেয়াজ, টমেটো, আলু, সিম, সয়াবিন, চীনাবাদাম, কমলালেবু, মাছের ডিম, ডিমের কুসুম ও ছানা প্রভৃতিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘বি’ পাওয়া যায়।
(৩) ভিটামিন- ‘সি’ : এ ভিটামিনের অভাবে স্কার্ভি রোগ হয়। রোগ প্রতিষেধক ক্ষমতা কমে যায়। দাঁত উঠতে দেরি হয়, হাঁড় শক্ত হতে পারে না, শিশুদের ওজন হ্রাস পায় ও খিটখিটে স্বভাব হয়।
সবরকম লেবু, আনারস, কলা, আপেল, পেয়াজ, আখ, টমেটো, পালংশাক, বাধাকপি, লাল আলু, মুগ, যব, ছোলা, মটরশুটি, দুধ, দৈ ও বিভিন্ন ধরনের টক ফল প্রভৃতিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ থাকে।
(৪) ভিটামিন- ‘ডি’ : এ ভিটামিনের অভাবে শিশুদের শীর্ণতা, রিকেট ও দাঁতে পোকা প্রভৃতি হয়, হাঁড় শক্ত হয় না। কডলিভার অয়েল, মাছের ডিম, ডিমের কুসুম, দুধ, মাখন ও আচার প্রভৃতিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘ডি’ আছে। সকালের রোদে ভিটামিন ‘ডি’ থাকে। এজন্য সূর্যের আলো গায়ে লাগাতে হবে। সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠলে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভিটামিন ‘ডি’ সহজেই শরীর সংগ্রহ করতে পারে- যা হাতে গোনা কয়েকটি খাদ্যদ্রব্যে পাওয়া যায়।
(৫) ভিটামিন- ‘ই’ : ভিটামিন ‘ই’ -এর অভাবে গর্ভ নষ্ট হয়। নারিকেল, কলা, সয়াবিন, বাদাম, মাংসের চর্বি, মাছের তেল, মাংস ও ডিম প্রভৃতিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘ই’ পাওয়া যায়।
চোখের যত্নে করণীয়
লেখাপড়া চোখের উপর নির্ভরশীল। চোখের মাধ্যমে পাঠের বিষয়বস্তু মস্তিষ্কে পৌঁছে থাকে। লেখাপড়া ছাড়াও চোখ মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি সম্পদ। তাই চোখের যত্ন নেয়া জরুরী। দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখার জন্য নিম্নলিখিত নিয়ম মেনে চললে সুফল পাওয়া যায়।
১. সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে জেগে উঠা।
২. প্রতিদিন ৪/৫ বার চোখ ধৌত করা। ওযু দ্বারা এ কাজ হয়ে যায়।
৩. স্বল্প আলো বা অধিক আলোতে লেখাপড়া করলে চোখের ক্ষতি হয়।
৪. দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা করার সময় এক ঘণ্টা পড়ার পর অন্তত ৫ মিনিট বিশ্রাম নেয়া উচিত। এ সময় সবুজ গাছপালার দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারলে উপকার পাওয়া যায়।
৫. ছোটমাছ, মিষ্টিকুমড়া ও সবুজ শাকসবজি নিয়মিত খেতে হবে। চোখের জন্য ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাদ্য বিশেষ উপকারী। অধিক রাত পর্যন্ত জেগে থাকা চোখের জন্য ক্ষতিকর।