পরিচ্ছেদঃ ৪
বিধান ও উপকারিতা :
ওয়াজিব-মোস্তাহাব, বা আবশ্যক-অনাবশ্যক সর্বস্তরের এবাদত বন্দেগির অভ্যন্তরে বিচরণ, এবং ছোট বড় সর্বশ্রেণীর পাপাচার অনাচারের ভয়ংকর বৃত্ত থেকে সম্পূর্ণ ভাবে আত্মরক্ষা—এ দু’টি বিষয়ই মানব-মানবীর ভিতরে অলিত্বের প্রতিভা সৃষ্টি করে। শামিল করে তাদের সেই শ্রেষ্ঠ অলিদের কাতারে যারা মহববত করে আল্লাহকে। আল্লাহ পাকও তাদের মহববত করেন—কেবল তাই নয়, বরং যারা তাদের মহববত করে তিনি তাদেরকেও ভালোবাসেন। অধিকন্তু, যে সমস্ত লোক আল্লাহ তাআলার এমন বন্ধুদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, অথবা তাদের কষ্ট দেয়, কিংবা ঘৃণা করে, অথবা তাদের সাথে প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা মূলক দুরাচার, অথবা কোনোরূপ অনিষ্ট ও ক্ষতি সাধনের কুটিল মতলব নিয়ে তাদের পিছু নেয়, তিনি সে সমস্ত দুষ্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাদের সাহায্য সহযোগিতার জিম্মাদার হন। বিধায় তিনি তাদের সহায়তা করেন।
আল্লাহর বন্ধুদের প্রতি মহববত পোষণ আবশ্যক, অপরদিকে তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ অবৈধ সর্বৈবে। এমনিভাবে, যারা তার সাথে শত্রুতায় লিপ্ত তাদের সাথে শত্রুতার মনোভাব ও তাদের বন্ধুত্ব বর্জন আবশ্যক।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ
যারা আমার ও তোমাদের শত্রু, তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। [আল মুমতাহিনা : ১]
অপর এক স্থানে তিনি বলেন—
وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آَمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ . ( المائدة : ৫৬)
যারা আল্লাহ, তার রাসূল ও মোমিনদের সাথে বন্ধুতা করে, তারাই আল্লাহর দল, আর আল্লাহর দলই বিজয়ী। [সূরা মায়েদা : ৫৬]
আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে আরো বলেছেন, তারা মোমিনদের প্রতি সদয় এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর।
হাদিসটি প্রমাণ করে, আল্লাহর বন্ধু দু শ্রেণীতে বিভক্ত।
প্রথমত: যারা ফরজ আদায়ের মাধ্যমে তার নৈকট্য হাসিল করে। এরা আসহাবে ইয়ামিন বা মধ্যপন্থী। ফরজ আদায়, নি:সন্দেহ, সর্বোত্তম এবাদত, যেমন বলেছেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.
أفضل الأعمال أداء ما افترض الله، والورع عما حرم الله، وصدق النية فيما عند الله .
‘সর্বোত্তম এবাদত হল যা আল্লাহ তাআলা ফরজ করেছেন, অত:পর আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় পরিহার এবং যা আল্লাহর কাছে রক্ষিত, তা লাভের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ নিয়ত।’ [যাদুদ দায়িয়াহ : ১৬]
দ্বিতীয়ত: ফরজ আদায়ের পর যারা নফল এবাদত, মাকরূহ বিষয়াদি পরিহার—ইত্যাদির অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করে। আল্লাহ তাদের প্রতি ভালোবাসা আবশ্যক করে নেন। উল্লেখিত হাদিসে এ দ্বিতীয় প্রকার অলিদের প্রতি বিশেষ আলোকপাত করে বলা হয়েছে—
وَلَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتّى أُحِبَّهُ
নফল এবাদত বন্দেগির মধ্য দিয়ে আমার বান্দা আমার নৈকট্য লাভ অব্যাহত রাখে এমনকি এ পর্যায়ে আমি তাকে ভালোবাসি। [বোখারি- ৬৫০২]
আল্লাহ তাআলা যে বান্দাকে ভালোবাসেন, সে বান্দার হৃদয়ে তার বাস্তব ভালোবাসা জাগিয়ে তোলেন এবং স্মরণ ও এবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিমগ্ন থাকতে পারে—এরূপ শক্তি-সামর্থ্য ও হিম্মত তাকে দান করেন। তদুপরি, আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য ও নৈকট্য বয়ে আনে এমন ধর্মকর্ম বা ধর্ম-পরায়ণতায় সে তার অন্তরঙ্গতা ও নিবিড় আন্তরিকতা খুঁজে পায়। ফলে ওই সব সু-কর্ম নিশ্চিত করে মহান আল্লাহর নিকটবর্তিতা এবং সাব্যস্ত করে ওই সংরক্ষিত অনন্ত নেয়ামতরাজি যা তাঁরই সকাশে সংরক্ষিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ( المائدة :৫৪)
হে মোমিনগণ, তোমাদের মধ্য থেকে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-বিনম্র হবে, এবং কাফেরদের প্রতি হবে কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে, এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় সর্বজ্ঞ। [মায়েদা : ৫৪]
বান্দার জন্য আল্লাহর মহববত অন্যতম মুখ্য বিষয়। যে ব্যক্তি তা প্রাপ্ত হবে, প্রাপ্ত হবে দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণ ও সৌভাগ্য। প্রকৃত মোমিন সেই, যে আল্লাহর অলি হওয়ার আকাঙ্খায় ব্যাগ্র-কাতর হবে। এ লক্ষ্যে নিজেকে নিয়োজিত করবে চূড়ান্ত অধ্যবসায়। আল্লাহর অলি হওয়ার লক্ষ্য অর্জিত হয় নানাভাবে—
(ক) যা পালন আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য ফরজ করেছেন, তা সুচারুরূপে পালন করা। হাদিসে এসেছে—
وَمَا تَقَرَّبَ إلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُهُ عَلَيْهِ
আমার বান্দা যে সমস্ত উপায়ে আমার নৈকট্য পায়, তন্মধ্যে তার প্রতি আমার আরোপিত ফরজ কর্ম সমূহই আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়।