পরিচ্ছেদঃ ৩
স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ :
আমরা জীবনে ব্যাপক কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম হব না যতক্ষণ না কোনো ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্ত ও সঠিক ফয়সালায় পৌছতে পারি। হ্যা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যদিও কঠিন হয়ে পড়ে; কিন্তু বারবার চর্চা করলে এর কৌশল রপ্ত হয়ে যায়, তখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া আর কঠিন মনে হয় না। কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে প্রথমে আমাদের কর্তব্য ইস্তিখারা করা, আল্লাহর কাছ থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা চেয়ে নেওয়া। যেমন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি :
عَنْ جَابِرٍ- رَضِيَ اللهُ عَنْهُ- قَالَ كَانَ النَّبِيُّ- صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ- يُعَلِّمُنَا الْاِسْتِخَارَةَ فِي الْأُمُوْرِ كُلِّهَا، كَالسُّوْرَةِ مِنَ الْقُرْآنِ : ( إِذَا هَمَّ أَحَدُكُمْ بِالْأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ مِنْ غَيْرِ الْفَرِيْضَةِ، ثُمَّ يَقُوْلُ : اللّهُمَّ إنِّيْ أسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ، وَ أسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَ أسْألُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيْمِ، فَإنَّكَ تَقْدِرُ وَ لآ أقْدِرُ، وَ تَعْلَمُ وَ لآ أعْلَمُ، وَ أنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوْبِ، اللّهُمَّ إنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أنَّ هذَا الْأمْرَ خَيْرٌ لِّيْ فِيْ دِيْنِيْ وَ مَعَاشِيْ وَ عَاقِبَةِ أمْرِيْ- أوْ قَالَ : فِيْ عَاجِلِ أمْرِيْ وَآجِلِه- فَاقْدُرْهُ لِيْ، وَ إنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أنَّ هذَا الْأمْرَ شَرٌّ لِّيْ فِيْ دِيْنِيْ وَ مَعَاشِيْ وَ عَاقِبَةِ أمْرِيْ- أوْ قَالَ : فِيْ عَاجِلِ أمْرِيْ وَ آجِلِه- فَاصْرِفْهُ عَنِّيْ وَ اصْرِفْنِيْ عَنْهُ، وَ اقْدُرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ رَضِّنِيْ بِه . ( وَ يُسَمِّيْ حَاجَتَه .)
জাবের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে কোনো কাজ করার পূর্বে ইস্তিখারার নির্দেশ দিতেন। তাই ইস্তিখারার দু‘আ এরূপ গুরুত্ব দিয়ে মুখস্থ করাতেন যেরূপ গুরুত্ব দিয়ে মুখস্থ করাতেন কুরআনের সূরা। ইসতেখারার নিয়ম এই যে, প্রথমে দুই রাকাত নফল সালাত পড়ে উল্লেখিত দু‘আ পাঠ করবে— যার অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার ইলমের মাধ্যমে আপনার কাছে কল্যাণ কামনা করছি। আপনার কুদরতের মাধ্যমে আপনার কাছে শক্তি কামনা করছি এবং আপনার মহা অনুগ্রহ কামনা করছি। কেননা আপনি শক্তিধর, আমি শক্তিহীন, আপনি জ্ঞানবান, আমি জ্ঞানহীন। আর আপনি অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানী। হে আল্লাহ, এই কাজটি (এখানে উদ্দিষ্ট কাজ বা বিষয়টি উল্লেখ করবেন) আপনার জ্ঞান মোতাবেক যদি আমার দ্বীন, আমার জীবিকা এবং আমার পরিণতির ক্ষেত্রে অথবা ইহলোক ও পরলোকে কল্যাণকর হয়, তবে তাতে আমাকে সামর্থ্য দিন। পক্ষান্তরে এই কাজটি আপনার জ্ঞান মোতাবেক যদি আমার দ্বীন, জীবিকা, ও পরিণতির দিক দিয়ে অথবা ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিকর হয়, তবে আপনি তা আমার থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন এবং আমাকেও তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন এবং কল্যাণ যেখানেই থাকুক, আমার জন্য তা নির্ধারিত করে দিন। অতপর তাতেই আমাকে পরিতুষ্ট রাখুন। (অতপর আপনি নিজ প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করবেন।) [বুখারী : ১১০৬; মুসলিম : ১৫৪০]
ইস্তিখারা করার পর কোন কাজ করলে কিংবা কাজটি কিভাবে করলে বেশি ফলদায়ক হবে তা জানার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির শরণাপন্ন হোন। তারপর দৃঢ় চিত্তে কাজটি করে ফেলুন। আর তার ফলাফলের ভার ছেড়ে দিন আল্লাহর হাতে। আল্লাহ যা করবেন তাতেই সন্তুষ্ট হবার মানসিকতা গড়ে তুলুন। সংকল্প করার পর আর দ্বিধায় ভুগবেন না। আল্লাহ জাল্লা শানুহূ বলেন,
﴿وَشَاوِرۡهُمۡ فِي ٱلۡأَمۡرِۖ فَإِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُتَوَكِّلِينَ ١٥٩﴾ [ آل عمران : 159]
‘আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরার্মশ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ {সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯}
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,
﴿وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ بَٰلِغُ أَمۡرِهِۦۚ﴾ [ الطلاق : 3]
‘আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই।’ {সূরা আত-তালাক, আয়াত : ০৩}
সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« مِنْ سَعَادَةِ ابْنِ آدَمَ رِضَاهُ بِمَا قَضَى اللَّهُ لَهُ وَمِنْ شَقَاوَةِ ابْنِ آدَمَ تَرْكُهُ اسْتِخَارَةَ اللَّهِ وَمِنْ شَقَاوَةِ ابْنِ آدَمَ سَخَطُهُ بِمَا قَضَى اللَّهُ لَهُ » .
‘আদম সন্তানের সৌভাগ্যের বিষয়সমূহ থেকে একটি হল ইস্তিখারা করা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। আর মানুষের দুর্ভাগ্য হল ইসতেখারা না করা ও আল্লাহর ফয়সালার ওপর অসন্তুষ্ট থাকা।’ [তিরমিযী : ২৩০৪; মুসনাদ আহমদ : ১৩৬৭]
জাতিসংঘে মার্কিন দূত এ ডি স্টেভিন্স বলেন, প্রত্যেক সিদ্ধান্তের দুটি স্তর রয়েছে। এক, কাজটি শুরু করা, দুই, কাজটি শেষ করা। এর মধ্যে প্রথম সিদ্ধান্ত গ্রহণই কঠিন। কারণ, যে কোনো কাজের সূচনা করাই সমস্যা। শিশুর পক্ষে A B C শুরু করাটাই কঠিন, নয়তো এ শিশুই বড় হয়ে কত সহজে ইংরেজিতে মাস্টার্স করছে। যে কোনো কাজ আরম্ভ করার ক্ষেত্রে হ্যা- না অনেক বড় ফ্যাক্টর। সঠিক ফয়সালা এবং নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ গুণ। নিজ অঙ্গনে যোগ্যতার বৈতরণী পার হওয়ার জন্য স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অপরিহার্য। চাই এ সিদ্ধান্ত কাজটির সূচনা সংক্রান্ত হোক, আর চাই শুরু করা কাজকে সুন্দর সমাপ্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে হোক। মনে রাখবেন, স্থির অবিচল সিদ্ধান্তই আপনাকে জীবনের চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হতে সাহায্য করবে।