পরিচ্ছেদঃ ১৫
ভাই যখন ভাইয়ের ‘জানি দুশমন’
আহমদ খালাফের মুখ থেকে এ-সব অশ্রাব্য কথা শুনেও তাকে শত্রু ভাবতে পারছিলো না। বরং এ-আচরণকে এক সাময়িক উত্তেজনা হিসাবে ধরে নিলো। তাই আবার সে খালাফকে স্নেহঝরা কণ্ঠে বললো, ‘খালাফ, তুমি শান্ত হও! তুমি যদি মনে করে থাকো, সম্পত্তিই তোমাকে সুখ ও সৌভাগ্য এনে দেবে, তাহলে বড়ো ভুল করবে তুমি! ধন-সম্পদ মানুষের কোনো কাজেই লাগে না, যদি তা সংরক্ষণের জন্যে উপযুক্ত জ্ঞান-বুদ্ধি না থাকে। শোন, তুমি যদি আল্লাহর হুকুম অমান্য করো, তাহলে কোনোদিন তোমার জীবনে সুখ-শান্তি আসবে না। তোমার কাছে তো ক’বছর আগেও লক্ষ লক্ষ দিরহাম ছিলো! সঠিক জ্ঞান-বুদ্ধির অভাবে তুমি তা নষ্ট করে ফেলেছো, কোনো কাজে লাগাতে পারো নি। তুমি কি ভেবেছো, আমার ক্ষতি করে বিবেকের দংশন থেকে তুমি বাঁচতে পারবে? পারবে না! আল্লাহর প্রতিশোধ থেকে তুমি রেহাই পাবে না!’
খালাফ আহমদের কথায় এবারও কান দিলো না। চীৎকার করে বলে উঠলো, ‘চুপ করো বলছি! এতো বকবক করবে না!’
এরপর খালাফ কী করলো?
এরপর সে গাধার চাবুক দিয়ে মানুষ পেটাতে লাগলো!
কেমন মানুষ?
নিজের আপন ভাই!
কেমন আপন ভাই?
সার্বক্ষণিক হিতাকাংখী!
এরপর কী হলো?
এরপর ভাইয়ের হাতে ভাই রক্তাক্ত হলো।
এ করুণ দৃশ্য দেখে আকাশ কাঁদলো,
বাতাস কাঁদলো,
কাঁদলো মরুভূমির বালুকণারাও বুঝি!
কাঁদলো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ বাকহীন জন্তুগুলোও বুঝি!
কাঁদলো আকাশের বুকে ভাসমান ঐ মেঘমালারাও বুঝি!
কাঁদলো না শুধু ভাইয়ের মন!
নিষ্ঠুরতায় ঘেরা যে ভাইয়ের মন,
তাকে কি ভাই বলা যায়?
চাবুকের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হতে লাগলো আহমদের দেহ। তবু সে প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে বাঁধনমুক্ত হওয়ার চিন্তা করলো না। ভাইকে কোনো কটু কথাও বললো না। নিষ্ঠুর ভাইকে নিষ্ঠুরতা দ্বারা বদলা দিলো না। নিষ্ঠুরতা যে তার ধাঁচেই নেই! তার হৃদয় জুড়ে তখনও তোলপাড় করছিলো ভ্রাতৃস্নেহ ও ভ্রাতৃমমতা! ভাই বলে কথা নয়; আহমদ কাউকেই শত্রু মনে করতে পারতো না। একেবারে ছোট্ট বেলা থেকেই সে বেড়ে উঠেছে ন্যায়ের উপর, ভালোবাসার উপর। সত্যের উপর, কল্যাণের উপর। তাই অশ্রুময়-রক্তময় চেহারা নিয়ে তাকালো সে খালাফের দিকে। বললো, ‘ভাই আমার! আল্লাহকে ভয় করো! তুমি কি ভুলে গেছো, আমি তোমার বড় ভাই? রক্তের বন্ধনকে পারবে তুমি অস্বীকার করতে? তা ছাড়া আমরা এক সঙ্গে শৈশব কাটাই নি, খেলি নি, দৌড়াই নি! শৈশবের স্মৃতি-জড়ানো মধুর দিনগুলোর কথা মনে করেও তুমি কি একটু সংযত হবে না? আমার উপর হাত তোলতে একটুও কি লজ্জাবোধ করবে না?
খালাফ! তুমি দিরহাম-দিনার চাও? বিশ্বাস করো, আমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারলে যা চাইবে আমি তোমাকে তাই দেব! তোমার যে কোনো ভালো প্রয়োজন ও সুন্দর ইচ্ছে পূরণে আমি চেষ্টা করবো। সুতরাং তুমি ভুল করো না। জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়ো না!’
খালাফ আরো বেশী উত্তেজিত হয়ে উঠলো। চীৎকার করে বলতে লাগলো, ‘কী! তুমি আমায় দিরহাম-দিনারের লোভ দেখাচ্ছো? বলি, তুমি আমায় দেবার কে? তার আর প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই একা একা সবকিছুর মালিক হয়ে যাচ্ছি। সব আমার বাবার সম্পত্তি। আর এই পণ্য সামগ্রী, এ-সব বিক্রি করে আমি এখন বাড়ি ফিরবো। এতেও তোমার কোনো ভাগ ও অধিকার নেই। তোমার আর বাড়ি ফেরা হবে না! এই গাছের সাথেই তুমি বাঁধা থাকবে। এখানেই তোমার মরণ হবে- হে কুকুর!’
কিন্তু হঠাৎ করে ঝড় উঠলো খালাফের সঙ্গীটির মনে। সে মেনে নিতে পারলো না খালাফের পরিকল্পনা। সে খালাফের কাছে এসে বললো, ‘কী বললে খালাফ? তুমি একা একা সব নিয়ে যাবে? তাহলে আমার ভাগ কোথায় যাবে?’
খালাফ ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘তোমার আবার ভাগ কিসের? তুমি তো এসেছো আমার বেতনভোগী কর্মচারী হিসাবে?’
‘অসম্ভব! আমার সাথে তোমার এমন কথা ছিলো না! তুমি আমাকে বলেছিলে- কোনো বিজন মরুতে আহমদকে কতল করে আমরা দু’জন সমান করে তার সমস্ত সম্পদ ভাগ করে নেবো! কী, বলো নি? কয়েকদিনের ব্যবধানেই সব ভুলে গেলে?!’