পরিচ্ছেদঃ ৩
কীভাবে আমরা সন্তানদের লালন-পালন করব
সন্তানের প্রতি সকলের মায়া মমতা স্বভাবতই বেশি থাকে। তাই বলে তারা যেন বিপথগামী না হয় সেদিকে সকলের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا﴾ [ التحريم : ٦ ]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিজনদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।” [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬৬]
মাতা-পিতা, শিক্ষক তথা সমাজের সকলেরই আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে সন্তানদের গঠন করার ব্যাপারে। যদি তারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে তবে সন্তানরা সুখী হবে এবং অন্যরাও দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী হবে যদি তাকে উত্তমভাবে গড়ে না তোলা হয় তবে সে দুর্ভাগা হবে। ফলে, তার পাপের ভার অন্যদের ওপরও বর্তাবে। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«كلُّكُم رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»
“তোমরা প্রত্যেকেই দেখাশুনাকারী, আর এ দেখাশুনার ব্যাপারে প্রত্যেককেই জবাবদিহি করতে হবে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮২৯।]
হে শিক্ষক! আপনার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেওয়া সুসংবাদ শ্রবণ করুন,
«فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا، خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ»
“যদি তোমার দ্বারা কোনো একজন ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তবে তা তোমার জন্য একটি লাল উটনী পাওয়ার চেয়েও উত্তম”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪০৬।]
আর হে অভিভাবকগণ! আপনাদের জন্যও কতই না উত্তম সুসংবাদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ : صَدَقَةٌ جَارِيَةٌ، وَعِلْمٌ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٌ صَالِحٌ يَدْعُو لَهُ»
“যখন কেউ মারা যায়, তখন তিন ধরনের আমল ব্যতীত অন্যান্য সমস্ত আমলের সাওয়াব বন্ধ হয়ে যায়; সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেককার সন্তান, যে তার জন্য দো‘আ করে”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৩১।]
তাই হে আমার মুরব্বী! প্রথমে নিজের সংশোধনে সচেষ্ট হউন, অন্যান্য কর্মের আগেই। সন্তানদের সম্মুখে আপনি যে ভালো কাজ করবেন তাই উত্তম। যা খারাপ তা পরিত্যাগ করুন। যদি শিক্ষক ও পিতামাতা তাদের সন্তানদের সম্মুখে উত্তম চরিত্র ও ব্যবহারে আদর্শবান হন, তবেই তারা উত্তম শিক্ষা পাবে। তাই নিম্নোক্ত বিষয়সমূহের ব্যাপারে আমাদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখা অতীব প্রয়োজন।
১। প্রথমে বাচ্চাদের ‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তথা তাওহীদ শিক্ষা দেওয়া। অতঃপর যখন তারা বড় হবে, তখন তাদের এই কালেমার অর্থ শিক্ষা দেওয়া।
২। সর্বদা সন্তানের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে আন্তরিক হওয়া। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন, রিযিক প্রদান করেন, বিপদ থেকে উদ্ধার করেন এবং তিনি এক ও তাঁর কোনো শরীক নেই তিনিই মা‘বূদ এবং ইবাদত পাওয়ার যোগ্য।
৩। সন্তানদের জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে উদ্ধুদ্ধ করা এবং জানিয়ে দেওয়া যে, যারা সালাত আদায় করবে, সাওম পালন করবে, মাতা-পিতার বাধ্য থাকবে, আর আল্লাহ যাতে রাযী খুশী হন সে সব কাজ করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সাথে সাথে তাদেরকে জাহান্নামের ব্যাপারে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করতে হবে। আর তাদের উপদেশ দিয়ে বলতে হবে- যারা সালাত আদায় করে না, মাতা পিতার অবাধ্য আচরণ করে, আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করে, আল্লাহ প্রদত্ত শরী‘আতী ব্যবস্থা ত্যাগ করে মানুষের তৈরি আইন দ্বারা বিচার কাজ সম্পন্ন করে আর অন্যদের ধন-দৌলত ধোঁকা দিয়ে, মিথ্যা কথা বলে, সুদের মাধ্যমে অথবা অন্যান্য উপায়ে আত্মসাৎ করে- তারাই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
৪। সর্বদা বাচ্চাদের এ শিক্ষা দিতে হবে যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নিকট দো‘আ করতে হবে এবং একমাত্র তাঁরই নিকট সাহায্য চাইতে হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচাতো ভাই ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বলেছেন,
«إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ»
“যদি কোনো দো‘আ কর, একমাত্র আল্লাহর নিকটই কর, যদি কোনো সাহায্য চাও, একমাত্র তাঁরই নিকট চাও”। [সুনান তিরমিযী, হাদীস নং ২৫১৬, হাদীসটি হাসান, সহীহ।]