পরিচ্ছেদঃ ১৫
ইসলাম বিনষ্টকারী কতিপয় বিষয়
ইসমালী বিধি-বিধান, রীতি-নীতি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং কুরআন ও সহিহ্ হাদিসের আলোকে সঠিক আকীদা শিক্ষা লাভ করা আমাদের উপর ফরজ। এর বিপরীত পথ অবলম্বন করা ভ্রষ্টতা। ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়ের কারণে মানুষ শিরক ও কুফর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বরং এর মাধ্যমে মানুষ মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যায়। যা একজন মুসলমানের জন্য চরম দুর্ভাগ্য ও পরিতাপের বিষয়। তাই নীচে অতি সংক্ষিপ্তাকারে ইসলাম বিনষ্টকারী কতিপয় বিষয় তুলে ধরা হল:
আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা:
আল্লাহ বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা তাঁর সাথে শরিক করার গুনাহ ক্ষমা করবেন না। এতদ্ব্যতীত অন্য সকল গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন।
আল্লাহ ও বান্দার মাখে মধ্যস্থতা স্থাপন করা:
যে ব্যক্তি তার ও আল্লাহর মাঝে কোন মধ্যস্থতাকারী স্থাপন করে তাকে ডাকে, অথবা তার নিকট দু‘আ করে অথবা তার কাছে সুপারিশ প্রার্থনা করে, তার উপর ভরসা করে সে ব্যক্তি কুফরি করল। আল্লাহ বলেন:
﴿وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ﴾ [ يونس : 18]
‘আর তারা উপাসনা করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্ত্তসমূহের যেগুলো না তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে; আর না উপকার করতে পারে।’ (সুরা ইউনুস: ১৮)
অমুসলিমদের কুফরির ব্যাপারে সন্দেহ করা :
যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপনকারী মুশরিকদের কাফের মনে না করে বা তাদের কুফরের ব্যাপারে সন্দেহ করে অথবা তাদের ধর্মীয় মতাদর্শকে সঠিক বলে বিশ্বাস করে, সে কাফের হয়ে যায়। কাফেরদের ব্যাপারে মুসলিমদের বিশ্বাস কি হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
﴿إِنَّا بُرَآَءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ﴾ [ الممتحنة : 4]
‘‘তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর তার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের প্রত্যাখ্যান করি। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হলো শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য যদি না তোমরা এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন কর। (সূরা মুমতাহিনাঃ ৪)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শের চেয়ে অন্য আদর্শকে উত্তম বা সম পর্যায়ের মনে করা :
যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস করে যে, নবী করিম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রদর্শিত পথ ও আদর্শ থেকে অন্য মতাদর্শ অধিক উপযোগী বা সমপর্যায়ভূক্ত এবং অন্যদের বিচার ও শাসন ব্যবস্থা নবীর বিচার ও শাসন ব্যবস্থা থেকে উত্তম বা সম পর্যায়ের সে ব্যক্তি কাফের।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন.
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴾ [ النساء : 65]
‘‘অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের মাঝে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ফয়সালা প্রদানকারী মনে করে। অতঃপর তোমরা মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন রকম সংকীর্ণতা অনুভব না করে এবং তা সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে নিবে।’’ (সুরা নিসা : ৬৫)
রাসূলের পক্ষ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত বিধানকে অপছন্দ করা:
যে ব্যক্তি নবী করিম স. এর আদর্শের কোন একটিকে অপছন্দ অথবা ঘৃণা করল সে কাফের হয়ে গেল, যদিও সে ঐ আদর্শ অনুযায়ী আমল করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ﴾ [ محمد : 9]
‘‘এটা এজন্য যে, আল্লাহ তা‘আলা নাজিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের সৎকর্ম বিনষ্ট করে দিলেন।’’ (সুরা মুহাম্মদ: ৯)
ইসলামের কোন একটি বিষয় নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করা :
যে ব্যক্তি রাসূল স. এর দ্বীনের কোন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল অথবা তার সওয়াব নিয়ে উপহাস করল, সেও কুফরি করল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿قُلْ أَبِاللَّهِ وَآَيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ (65) لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ﴾ [ التوبة : 65، 66]
‘‘হে নবী! আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহ তাঁর আয়াত এবং তদীয় রাসূলের সাথে ঠাট্টা করেছিলে? ছলনা করনা, তোমরা ঈমান প্রকাশ করার পর কফের হয়ে গিয়েছ। (সুরা তাওবা: ৬৫-৬৬)
জাদু ও গণকের আশ্রয় নেয়া : যে ব্যক্তি জাদু জাতীয় কাজ করবে এবং তা পছন্দ করবে, এর উপর সন্তুষ্ট থাকবে তার এ কাজ কুফরি বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ﴾ [ البقرة : 102]
‘‘তারা (হারূত ও মারূত) এ কথা না বলে কাউকেই জাদু শিক্ষা দিত না যে, আমরা (যা করছি তা) পরীক্ষা স্বরূপ। কাজেই তুমি কুফরি করো না। (সূরা বাকারাহ: ১০৭)
এ আয়াতে জাদু শিক্ষা করাকে কুফরি বলা হয়েছে। যারা তা শিখবে, পছন্দ করবে বা তদনুযায়ী আমল করবে তারা কাফের হয়ে যাবে।
মুসলমানদের বিপক্ষে ইহুদি খৃষ্টান ও কাফেরদের সাহায্য করা : মুসলমানদের বিপক্ষে মুশরিক ও কাফেরদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করা, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা কুফরি। যারা এরূপ করে তারা কাফের হয়ে যায়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ﴾ [ المائدة : 51]
‘তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা জালিমদেরকে হেদায়াত করেন না।’’ (মায়েদাহ-৫১)
নিজেকে শরয়ি বিধান পালনের উর্ধে মনে করা:
যারা এ ধারণা পোষণ করে যে, কোন কোন লোকের জন্য শরিয়ত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ আছে অর্থাৎ তাদের জন্য ইসলামী
বিধি বিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই, তারা কাফের। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾ [ آل عمران : 85]
‘যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছুকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করতে চায়, তা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।’’ (আলে ইমরানঃ ৮৫)
ইসলাম জীবন- পদ্ধতি থেকে বিমুখ হওয়া :
যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন বর্জন করল, তা থেকে বিমুখ হল এবং তা পালন ও শিক্ষা গ্রহণ থেকে বিরত হল বস্ত্তত : সে কুফরি করল।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآَيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ﴾ [ السجدة : 22]
‘‘যে ব্যক্তিকে তার পালনকর্তার আয়াত সমূহ দ্বারা উপদেশ দান করা হয়, অতঃপর সে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে? নিশ্চয় আমি অপরাধীদের শাস্তি প্রদান করব।’’ (সাজদাহ:২২)
উপরের আলোচনা থেকে আমরা ইসলাম বিনষ্টকারী যে সকল কারণ ও তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারলাম তা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ঈমান রক্ষার জন্য আমাদের একমাত্র কুরআন ও সহীহ হাদিস অনুযায়ী আমল করতে হবে। সাথে সাথে সব ধরনের শিরক বিদ‘আত, কুফরি এবং ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ থেকে সম্পূর্ণ দুরে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলাম বিনষ্টকারী শিরক ও কুফরি কাজ থেকে বিরত থাকার তওফীক দান করুন। আমিন!