পরিচ্ছেদঃ ১০
অফিস বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে :
আপনি যদি হন কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক কিংবা অফিসের এমডি তবে আপনার কাজেও কম্পিউটার সাহায্য করতে প্রস্তুত। প্রতিষ্ঠানের কাজে আপনাকে নিশ্চয় যেতে হয় ব্যাংকে। দেখবেন ব্যাংকের এমডি সাহেব তাঁর কাঁচে ঘেরা কক্ষে বসে নিরবে পর্যবেক্ষণ করছেন অফিসের কে কোন কাজে ব্যস্ত। সিসিটিভির মাধ্যমে আজকাল বড় বড় শপিং মলগুলোতেও এসবের পরিচালকরা নিজ জায়গায় বসে নিরবে সব ক্রেতা ও দর্শকসহ সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছেন। আমাদের রাজধানী ঢাকা শহরসহ উন্নত বিশ্বের সকল সড়কে এই কম্পিউটারের মাধ্যমে ট্রাফিক সিগন্যাল দেয়া যায়। দায়িত্বশীলগণ পথ-ঘাট ও যানবাহন চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। অফিসে যদি সবাই কাজ করেন কম্পিউটারে তাহলে কম্পিউটারে বসে কে কোন কাজ করছে তা আপনি নিজ রুমে বসেই পর্যবেক্ষণ করতে পারেন কম্পিউটার নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে।
পরিতাপের বিষয় হলো, অনেকে কেবল না জানা বা ইচ্ছা না করার কারণে এই কম্পিউটার নামক যন্ত্র কিনে এতে শুধু গান শোনা কিংবা নাটক/সিনেমা দেখা ছাড়া কোনো কাজে লাগান না। কেউ কেউ নিজের অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাচ্চাকেও কম্পিউটার কিনে দেন, সে শুধু গেমস খেলা ছাড়া আর কোনো কাজে একে লাগায় না। ইদানীং আবার অনেকে বুদ্ধি খাটিয়ে পুরান কম্পিউটারের একখানি মনিটর কেনেন। তারপর তাতে টিভি কার্ড লাগিয়ে টেলিভিশন দেখার অতি সখের (?) কাজটি সারেন! হাস্যকর ব্যাপার হলো, কম্পিউটারের এমন নেতিবাচক ব্যবহার দেখে অনেকে এই নিরীহ বস্তুটির প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে যান। তারা যে কারো কম্পিউটার ব্যবহারকেই নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন।
বস্তুত পৃথিবীতে যত প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে এবং আগামীতে হবে সবগুলোই আল্লাহর দান। আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি আর প্রকৃতিতে নানা উপাদান দিয়েছেন বলেই ক’দিন পরপর নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে। অতএব আমাদের বরং শুকরিয়ার সঙ্গে এসব নেয়ামত ভোগ করা দরকার। আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহে এসবকে কাজে লাগানো উচিত। পক্ষান্তরে প্রযুক্তির প্রতি বিদ্বেষ রাখা মূলত আল্লাহর নেয়ামতকেই অবহেলা বা অস্বীকারের নামান্তর। কেউ যদি অপরাধ করে, আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ করে তবে তার দায় কেবল তার ওপরই বর্তাবে। অন্য কারও ওপর এর বোঝা চাপানো যাবে না। অন্য কাউকে এ দোষে দোষী বানানো যাবে না। নিচের আয়াতগুলোয় দেখুন কত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কথাগুলো। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿ إِن تَكۡفُرُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَنِيٌّ عَنكُمۡۖ وَلَا يَرۡضَىٰ لِعِبَادِهِ ٱلۡكُفۡرَۖ وَإِن تَشۡكُرُواْ يَرۡضَهُ لَكُمۡۗ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُم مَّرۡجِعُكُمۡ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَۚ إِنَّهُۥ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ ٧ ﴾ [ الزمر : ٧ ]
‘তোমরা যদি কুফরী কর তবে (জেনে রাখ) আল্লাহ তোমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী; আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না এবং তোমরা যদি শোকর কর তবে তোমাদের জন্য তিনি তা পছন্দ করেন; আর কোন বোঝা বহনকারী অপরের বোঝা বহন করে না। তারপর তোমাদের রবের দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে। তখন তোমরা যে আমল করতে তিনি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় অন্তরে যা আছে তা তিনি সম্যক অবগত’। {সূরা আয-যুমার, আয়াত : ৭}
﴿ مَّنِ ٱهۡتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهۡتَدِي لِنَفۡسِهِۦۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيۡهَاۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبۡعَثَ رَسُولٗا ١٥ ﴾ [ الاسراء : ١٥ ]
‘যে হিদায়াত গ্রহণ করে, সে তো নিজের জন্যই হিদায়াত গ্রহণ করে এবং যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের (স্বার্থের) বিরুদ্ধেই পথভ্রষ্ট হয়। আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না। আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই’। {সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ১৫}
﴿ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ وَإِن تَدۡعُ مُثۡقَلَةٌ إِلَىٰ حِمۡلِهَا لَا يُحۡمَلۡ مِنۡهُ شَيۡءٞ وَلَوۡ كَانَ ذَا قُرۡبَىٰٓۗ إِنَّمَا تُنذِرُ ٱلَّذِينَ يَخۡشَوۡنَ رَبَّهُم بِٱلۡغَيۡبِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَۚ وَمَن تَزَكَّىٰ فَإِنَّمَا يَتَزَكَّىٰ لِنَفۡسِهِۦۚ وَإِلَى ٱللَّهِ ٱلۡمَصِيرُ ١٨ ﴾ [ فاطر : ١٨ ]
‘আর কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না এবং কোন ভারাক্রান্ত ব্যক্তি যদি তার বোঝা বহনের জন্য কাউকে ডাকে তবে তার বোঝার কোন অংশই বহন করা হবে না যদিও সে আত্মীয় হয়; তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করবে যারা তাদের রবকে না দেখেও ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে; আর যে ব্যক্তি পরিশুদ্ধি অর্জন করে সে নিজের জন্যই পরিশুদ্ধি অর্জন করে। আর আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তন’। {সূরা ফাতির, আয়াত : ১৮}
﴿ قُلۡ أَغَيۡرَ ٱللَّهِ أَبۡغِي رَبّٗا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيۡءٖۚ وَلَا تَكۡسِبُ كُلُّ نَفۡسٍ إِلَّا عَلَيۡهَاۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُم مَّرۡجِعُكُمۡ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ فِيهِ تَخۡتَلِفُونَ ١٦٤ ﴾ [ الانعام : ١٦٤ ]
‘বল, ‘আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন রব অনুসন্ধান করব’ অথচ তিনি সব কিছুর রব’? আর প্রতিটি ব্যক্তি যা অর্জন করে, তা শুধু তারই উপর বর্তায় আর কোন ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের রবের নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে সেই সংবাদ দেবেন, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে’। {সূরা আল-আন‘আম, আয়াত : ১৬৪}
কে কী করছে, কে কম্পিউটার কোন খারাপ কাজে লাগাচ্ছে তার হিসাব রাখা বা তার ওপর বিধান জারি করা আমার দায়িত্ব নয়। তেমনি না জেনে, নিশ্চিত না হয়ে প্রমাণ ব্যতিরেকে কাউকে মন্দ ঠাওরানোও আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿ وَلَا تَقۡفُ مَا لَيۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمٌۚ إِنَّ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡبَصَرَ وَٱلۡفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَٰٓئِكَ كَانَ عَنۡهُ مَسُۡٔولٗا ٣٦ ﴾ [ الاسراء : ٣٦ ]
‘আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে’। {সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬}
কেউ কম্পিউটারে সিনেমা দেখছে বা গুনাহ কামাই করছে দেখে আপনি এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না। জাগতিক কোনো কিছু অর্জন যদি আপনার অনায়াস সাধ্য হয় আর তা আপনার উপকার ছাড়া অপকার না করে তবে একে অবজ্ঞা করা কাম্য নয়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿ وَٱبۡتَغِ فِيمَآ ءَاتَىٰكَ ٱللَّهُ ٱلدَّارَ ٱلۡأٓخِرَةَۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ ٱلدُّنۡيَاۖ وَأَحۡسِن كَمَآ أَحۡسَنَ ٱللَّهُ إِلَيۡكَۖ وَلَا تَبۡغِ ٱلۡفَسَادَ فِي ٱلۡأَرۡضِۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُفۡسِدِينَ ٧٧ ﴾ [ القصص : ٧٧ ]
‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না’। {সূরা আল-কাসাস, আয়াত : ৭৭}
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হয়ে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করার তাওফীক দান করুন। কম্পিউটারকে বানিয়ে দিন আমাদের আখেরাতে পদোন্নতির সোপান। আমীন।