- ড. সালেহ ইবন আব্দিল্লাহ আল-আবূদ
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর অসংখ্য প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অগণিত দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক, যাকে আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত নবী ও রাসূলদের সর্বশেষে প্রেরণ করে এ ধারা বন্ধ করে দিয়েছেন এবং যার দীনকে কিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার ওয়াদা করেছেন, যার পরে কোনো নবী আসে নি এবং আসবেও না যদিও মিথ্যুকরা এ ব্যাপারে চেষ্টা করতে কম করে নি।
আল্লাহ ইসলামকেই একমাত্র মনোনিত দীন হিসাবে গ্রহণ করেছেন। সুতরাং কারো থেকে অন্য কোনো দীনের অনুসারী হওয়া মেনে নিবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥﴾ [ ال عمران : ٨٥ ]
“আর যে ইসলাম ছাড়া অপর কোনো দীন চায়, তার থেকে তা কখনো গ্রহন করা হবে না, বরং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে গণ্য হবে”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫]
ইসলামের তিনটি স্তর রয়েছে:
প্রথম স্তর: ইসলাম (বাহ্যিক দিক) এর ৫টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে।
১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সঠিক উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূল বলে সাক্ষ্য দেওয়া।
২. সালাত প্রতিষ্ঠা করা।
৩. যাকাত প্রদান করা।
৪. রমযানের সাওম পালন করা।
৫. সক্ষম ব্যক্তির জন্য আল্লাহর ঘর কা‘বার হজ করা।
দ্বিতীয় স্তর: ঈমান (অভ্যন্তরীন দিক) এর ৬টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে:
১. আল্লাহর ওপর ঈমান আনা।
২. ফিরিশতাদের ওপর ঈমান।
৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের ওপর ঈমান, কুরআনে কারীমে সকল কিতাবের কথাই এসেছে।
৪. আল্লাহর রাসূলগণের ওপর ঈমান আনা যার ধারা শেষ হয়েছে, মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ দ্বারা যিনি আরবী; হাশেমী গোত্র থেকে ছিলেন, জন্ম ও নবী হিসেবে মনোনিত হয়েছিলেন মক্কাতে হিজরত ও মারা গিয়েছিলেন মদীনা মুনাওয়ারায়।
৫. আখিরাতের ওপর ঈমান আনা।
৬. তাকদীর বা ভাগ্যের ওপর ঈমান আনা, এমনভাবে যে, ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।
তৃতীয় স্তর: ইহসান, যার অর্থ, প্রত্যেক মুমিন মুসলিম এমনভাবে আল্লাহর উপাসনা করবে। যেমন, সে তাকে দেখছে, আর যদি তা সম্ভব না হয়ে উঠে, তবে এমনভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা যেন আল্লাহ তাকে দেখছেন।
তবে ইসলামের (বাহ্যিক অংশের) ভিত্তি ও চুড়া হলো, এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সঠিক কোনো উপাস্য নেই, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরই প্রেরিত রাসূল।
এ শাহাদাত বা সাক্ষ্য দেওয়ার অর্থ হচ্ছে: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাসনার যোগ্য সঠিক উপাস্য বা মা‘বুদ নেই। এ সব জানা, বুঝা, বিশ্বাস করা এবং মনে-প্রাণে আঁকড়ে ধরা, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ তাঁর বান্দা। সুতরাং তার ইবাদত বা উপাসনা না করা, তিনি তাঁর রাসূল হেতু তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা, তিনি যে সমস্ত সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোকে সত্য বলে জানা তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলোকে অনুসরণ করা, যা নিষেধ করেছেন তা ত্যাগ করা। আর আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে তার কথার ওপর নির্ভর করা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত পন্থা ছাড়া অন্য কোনো পন্থায় আল্লাহর ইবাদত না করা, আর সে অনুসারে আমল করা এবং অপরের কাছে সেটা পৌঁছানো, জানানো, বিবৃত করণ এবং অপরকে নির্দেশ দেওয়া, আর যতটুকু সম্ভব এ ব্যাপারে বাধ্য থাকা বা আনুগত্য করা।
তবে এই সাক্ষ্য ঐ পর্যন্ত যথার্থভাবে সম্পন্ন হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সাক্ষ্যদাতা এর অর্থ অন্তনিহিত তথ্য সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জ্ঞাত না হবে, সাথে সাথে তার সে জ্ঞান হতে হবে দৃঢ় বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার সামনে সন্দেহ ও অজ্ঞতার কোনো স্থান থাকবে না, তিরোহিত দূরিভূত করবে মিথ্যার ও অসত্যের বেড়াজাল।
অনুরূপভাবে এ সাক্ষ্য সম্পন্ন হওয়ার অন্য আরেকটি শর্ত হলো: সাক্ষ্যদাতাকে সম্পূর্ণ কায়োমনোবাক্যে খাঁটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে অবিকৃতভাবে তা মেনে নিতে হবে, যাতে করে তার বিপরীত শির্ক বা বিদ‘আত সেখানে স্থান না পায়।
শির্ক হলো, ইবাদতের কোনো অংশকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের দিকে নিবদ্ধ করা, আর বিদ‘আত হলো ইবাদত বা উপাসনা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের বিপরিতে অনুষ্ঠিত হওয়া।
সুতরাং যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দান পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবে তাকে শির্ক বিদ‘আত স্পর্শ করতে পারবে না।
এমনিভাবে এ সাক্ষ্য হতে হবে এমন দৃঢ় বিশ্বাস ওপূর্ণ বশ্যতার ভিত্তিতে যার সামনে এর অন্তর্নিহিত ও অবশ্যাম্ভাবী বস্তুসমূহে অস্বীকার বিদ্রোহ ও ঘৃণার নাম তা ব্যত্ত থাকবে না। আর তা হলো, শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত এবং কেবল তাঁর রাসূলেরই অনুসরণ। আর এ সাক্ষ্য হতে হবে সম্পূর্ণভাবে এ সাক্ষ্য দান ও সাক্ষ্যদানকারীদের মনে-প্রাণে ভালোবেসে, যাতে করে এ সাক্ষ্য যারা দেয় না অন্তরের অন্তস্থলে তাদের প্রতি অপছন্দভাব ফুটে উঠবে, যা মূলত শির্ক ও বিদ‘আতকেই অপছন্দ করা এবং শির্ককারী মুশরিক ও বিদ‘আতকারীদেরকে এমন অপছন্দ করতে হবে যেমন তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা সে অপছন্দ করে।
এ বন্ধুত্ব এবং শত্রুতার নীতির ওপর ভিত্তি করে আমার প্রিয় ভাই রফি উনলা বাছীরী “কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?” এ প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়াস পেয়েছেন। যদিও মুসলিমগণ তাদেরকে আগেই অমুসলিম সংখ্যালঘু হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ তাদের কাছ থেকে এটা স্পষ্টভাবে এসেছে যে, তারা এক মিথ্যুক নবুওয়াতের দাবীদারের অনুসারী। কিন্তু তারা ইসলাম নামের ছত্রছায়ায় সারা বিশ্বে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক স্থানে শক্তিশালী আস্তানা গেড়ে তার মাধ্যমে ইসলামের বিকৃত চিত্র মানুষের কাছে পেশ করছে। সুতরাং এ ব্যাপারে সাবধান করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে মিথ্যাবাদীদেরকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল এর বাণীতে যেভাবে ধিকৃত করা হয়েছে তা প্রচার ও প্রসার করা আজকের দিনে খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَمَنۡ أَظۡلَمُ مِمَّنِ ٱفۡتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوۡ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمۡ يُوحَ إِلَيۡهِ شَيۡءٞ ﴾ [ الانعام : ٩٣ ]
“তার চেয়ে কে বেশি অত্যাচারী যে আল্লাহর ওপর মিথ্যার সম্পর্কে দেখায় অথবা বলে আমার কাছে অহী (বাণী) এসেছে অথচ তার কাছে কিছুই আসে নি”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৯৩]
অনুরুপভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে পর্যন্ত ত্রিশ জনের মতো মিথ্যুক প্রতারক, যাদের সবাই মনে করবে তারা আল্লাহর রাসূল, তারা প্রকাশ না পাবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না।” [সহীহ বুখারী ৩/২৪৩; সহীহ মুসলিম ৪/২২৪০]
তিনি আরও বলেন, “আমি সমস্ত নবীদের ধারা সমাপ্তকারী, আর আমার মসজিদ হলো শ্রেষ্টত্বের দিক থেকে সর্বশেষ মসজিদ”। [সহীহ মুসলিম ২/১০১২] সুতরাং যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে নবুওয়াতের দাবী করবে সে মিথ্যুক। আর এই কাদিয়ানীরা যদিও তার নিজেদের মুসলিম মনে করে থাকে; বস্তুতঃ তারা ইসলামের ওপর জঘণ্য আঘাত হেনেছে। ইবাদতের ক্ষেত্রে, নবুওয়াতের মূলে করেছে কুঠারাঘাত, যে প্রধান মূলনীতির ওপর ইসলামের প্রতিষ্ঠা সেটা নষ্ট করেছে, আর তা হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সঠিক উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল -তারা এ প্রধান বিশ্বাসকে জলাঞ্জলী দিয়েছে। আল্লাহ তাদের সাথে প্রাপ্য ব্যাবহারই করুন এবং তাদের ফিৎনা ও অনুরূপ প্রত্যেক প্রতারকের ফিৎনা থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন। দো‘আ করি যেন আল্লাহ এর লিখককে উত্তম প্রতিদান প্রদান করেন।
وصلى الله على خاتم الأنبياء ورسله وعلى آله وأصحابه أجمعين .
সালেহ ইবন আবদুল্লাহ আল আবুদ [প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা শরীফ।]
১০/০৯/১৪১৩ হি.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
الحمد لله وحده، وصلوات الله وسلامه على من لا نبي بعده، وبعد !
কাদিয়ানীদের বাহ্যিক চাকচিক্যময় কথা-বার্তায় অনেকেই প্রতারিত হয় এবং প্রশ্ন রাখে কাদিয়ানীদেরকে খারাপ বল কেন? তারা তো নিজেদেরকে মুসলিমই বলে থাকে।
এ উদ্ভূত প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাদের নিম্নের কয়েকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
ক. তাদের ইতিহাস
খ. তাদের আকীদা-বিশ্বাস
গ. তাদের দৈনন্দিন সম্পাদিত কার্যাদি, অর্থাৎ আরকানে ইসলাম সম্পর্কে তাদের মতামত।