পরিচ্ছেদঃ ১৪
মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্ সম্পর্কে জানার এ ধরনের উপায় হচ্ছে মোট পাঁচটি [মাকাসিদুশ-শারীয়াহ্ আল-ইসলামিয়াহ, ড. মুহাম্মাদ সা‘দ আল-ইয়ূবী, পৃঃ ১২৩।]
আল-ইস্তেকরা তথা গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধানঃ
ইস্তেকরা হচ্ছে শরীয়াহ্-এর সকল দলীল ও হুকুম-আহকাম পূর্ণ অনুসন্ধান করে শারীয়াহ্ এর উদ্দেশ্য ও মাকাসিদ এর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া। যেমন, শরীয়াহ্-এর সকল দলীল ও হুকুম-আহকাম অনুসন্ধান করে জানা যায় যে, মানব জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ (আদ্-দারুরিয়্যাত) সর্বমোট পাঁচটিঃ দীন, প্রাণ বা জীবন, বিবেক-বুদ্ধি, সম্পদ ও বংশধারার হেফাযত। অতএব সহজেই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এ পাঁচটি বিষয়ের হেফাযত ও সংরক্ষণ শারীয়াহ্ প্রণেতার অন্যতম উদ্দেশ্য।
শার‘য়ী নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞাসমূহের কারণ জানাঃ
ইসলামী শারীয়াহ্-তে যে সকল নির্দেশাবলী কিংবা নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে যে কারণ দর্শানো হয়েছে তদ্বারা শারীয়াহ্-এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١ ﴾ [ البقرة : ٢١ ]
‘‘হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের সে প্রতিপালকের ইবাদাত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার’’ [সূরা আল-বাকারাহ : ২১]।
﴿ وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُسۡلِمِينَ ٨٩ ﴾ [ النحل : ٨٩ ]
‘‘আর আমি আপনার উপর গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি সকল কিছুর স্পষ্ট ব্যাখ্যা করার জন্য এবং মুসলিমদের উদ্দেশ্যে হেদায়াত ও রহমাত এবং সুসংবাদ প্রদানের জন্য...’’ [সূরা আন-নাহল : ৮৯]।
﴿ مَّآ أَفَآءَ ٱللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡقُرَىٰ فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِ كَيۡ لَا يَكُونَ دُولَةَۢ بَيۡنَ ٱلۡأَغۡنِيَآءِ مِنكُمۡۚ ﴾ [ الحشر : ٧ ]
‘‘আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রাসূলকে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহর, তাঁর রাসূলের, রাসূলের স্বজনগণের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের, যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই সম্পদ আবর্তন না করে’’ [সূরা আল-হাশর : ৭]।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّمَا نَهَيْتُكُمْ مِنْ أَجْلِ الدَّافَّةِ الَّتِى دَفَّتْ فَكُلُوا وَادَّخِرُوا وَتَصَدَّقُوا
‘‘মদীনায় আগমনকারী ভ্রমণ কাফেলার কারণেই আমি তোমাদেরকে (কুরবানীর গোশ মজুদ করতে) নিষেধ করেছিলাম। তবে এখন তোমরা তা ভক্ষণ করতে পার, মজুদ করতে পার এবং সদকা প্রদান করতে পার’’ [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫২১৫]।
প্রাথমিকভাবে আরোপিত যে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ কিংবা নিষেধাজ্ঞাঃ
এ থেকে বুঝা যায় যে, নির্দেশটি কার্যে পরিণত করা হোক এবং নিষেধকৃত বস্তু থেকে বিরত থাকা হোক - এটাই শারীয়াহ্ প্রণেতার ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য। অতএব কেউ যদি শারীয়াহ্ এর নির্দেশ বাস্তবায়ন না করে কিংবা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে সে শারীয়াহ্-এর মাকাসিদ ও উদ্দেশ্যের বিরোধিতা করল।
যে বক্তব্য থেকে সরাসরি মাকাসিদ সম্পর্কে জানা যায়ঃ
এ ধরনের বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে শারীয়াহ্ প্রণেতা স্বয়ং তার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করা। যেমন আল্লাহর বাণী,
﴿ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ ﴾ [ البقرة : ١٨٥ ]
‘‘আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান এবং যা তোমাদের জন্য ক্লেশকর তা চান না’’ [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৮৫]।
তিনি আরো বলেন,
﴿ يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمۡ وَيَهۡدِيَكُمۡ سُنَنَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ وَيَتُوبَ عَلَيۡكُمۡۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٞ ٢٦ وَٱللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيۡكُمۡ وَيُرِيدُ ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلشَّهَوَٰتِ أَن تَمِيلُواْ مَيۡلًا عَظِيمٗا ٢٧ ﴾ [ النساء : ٢٦، ٢٧ ]
‘‘আল্লাহ ইচ্ছা করেন তোমাদের কাছে বিশদভাবে বিবৃত করতে, তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি তোমাদেরকে অবহিত করতে এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করতে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান, আর যারা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে তারা চায় যে, তোমরা ভীষণভাবে পথচ্যুত হও’’ [সূরা আন-নিসাঃ ২৬-২৭]।
﴿مَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيَجۡعَلَ عَلَيۡكُم مِّنۡ حَرَجٖ وَلَٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمۡ﴾ [ المائدة :٦]
‘‘আল্লাহ তোমাদেরকে কষ্ট দিতে চান না, বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান...’’ [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৬]।
এ ধরনের বক্তব্যের মধ্যে আরো রয়েছে - নির্ধারণ করে দেয়া, ফরয করা, হুকুম দেয়া, নির্দেশ প্রদান করা, অনুমতি দেয়া, হারাম করা ইত্যাদি। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿ ۞وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنًاۚ ﴾ [ الاسراء : ٢٣ ]
‘‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত না করতে এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে’’ [সূরা আল-ইসরা (বনী ইসরাঈল): ২৩]।
﴿ذَٰلِكُمۡ حُكۡمُ ٱللَّهِ يَحۡكُمُ بَيۡنَكُمۡۖ ﴾ [ الممتحنة : ١٠ ]
‘‘এটাই আল্লাহর বিধান। তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে থাকেন’’ [সূরা মুমতাহিনা : ১০]।
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ ﴾ [ البقرة : ١٨٣ ]
‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে’’ [সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৩]।
﴿ ۞إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُ بِٱلۡعَدۡلِ وَٱلۡإِحۡسَٰنِ ﴾ [ النحل : ٩٠ ]
‘‘আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করছেন ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচারণের...’’। [সূরা আন-নাহলঃ : ৯০]
এ সকল বক্তব্যের মধ্যে আরো রয়েছে - কল্যাণকর, অকল্যাণকর কিংবা উপকারী বা ক্ষতিকর অথবা প্রিয় বা অপ্রিয় বলে উল্লেখ করা। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿ وَأَن تَصُومُواْ خَيۡرٞ لَّكُمۡ ﴾ [ البقرة : ١٨٤ ]
‘‘আর সাওম পালন তোমাদের জন্য উত্তম’’ [সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৪]।
﴿ فَإِن كَرِهۡتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰٓ أَن تَكۡرَهُواْ شَيۡٔٗا وَيَجۡعَلَ ٱللَّهُ فِيهِ خَيۡرٗا كَثِيرٗا ١٩ ﴾ [ النساء : ١٩ ]
‘‘তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর তবে এমন হতে পারে যে, তোমরা কিছু অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন’’ [সূরা আন-নিসা : ১৯]।
৫. নির্দেশ দান বা নিষেধ করার বাস্তব কারণ থাকা সত্ত্বেও তা না করে শারীয়াহ্ প্রণেতার চুপ থাকা। যদি প্রয়োজনীয় কার্যকারণ থাকা সত্বেও শারীয়াহ্-এর নির্দেশ না আসে তাহলে বুঝতে হবে উক্ত কাজে শারীয়াহ্-এর অনুমোদন নেই। আবার নিষেধ করার যথার্থ কারণ ও উপলক্ষ থাকা সত্ত্বেও যদি শারীয়াহ্ কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত না হয়, তাহলে বুঝতে হবে কাজটি শারীয়াহ্-এর দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয়।