পরিচ্ছেদঃ ৫১
ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করার বিধান
ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠের ব্যাপারে বিদ্বানদের ৩টি অভিমত রয়েছে।
১. সিররী অথবা যেহরী কোন সালাতেই ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করা যাবে না।
২. যেহরী সালাতে পড়া যাবে না তবে সিররী সালাতে ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে।
৩. সিররী অথবা যেহরী যে কোন সালাতই হোক সর্বাবস্থায় ইমাম ও মুক্তাদী সকলের জন্য সকল প্রকার সালাতে প্রতি রাক‘আতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব। নিম্নে এ সম্পর্কে দলীলসমূহ উলেখ করা হলো :
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ - - قَالَ : مَنْ صَلّٰى صَلَاةً لَمْ يَقْرَأْ فِيْهَا بِأُمِّ الْقُرْاٰنِ فَهِىَ خِدَاجٌ - ثَلَاثًا - غَيْرُ تَمَامٍ . فَقِيْلَ لِأَبِى هُرَيْرَةَ إِنَّا نَكُوْنُ وَرَاءَ الْإِمَامِ . فَقَالَ اِقْرَأْ بِهَا فِى نَفْسِكَ فَإِنِّىْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ - يَقُوْلُ : قَالَ اللهُ تَعَالٰى قَسَمْتُ الصَّلَاةَ بَيْنِىْ وَبَيْنَ عَبْدِىْ نِصْفَيْنِ وَلِعَبْدِىْ مَا سَأَلَ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুলাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি সালাত আদায় করল, যার মধ্যে উম্মুল কুরআন অর্থাৎ সূরা ফাতিহা পাঠ করল না তার ঐ সালাত বিকলাঙ্গ, বিকলাঙ্গ, বিকলাঙ্গ ও অপূর্ণাঙ্গ। রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ) কে বলা হলো, আমরা যখন ইমামের পেছনে থাকি, তখন কীভাবে পাঠ করব? তখন তিনি বললেন, তুমি তা চুপে চুপে পাঠ করবে। কেননা আমি রাসূলুলাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি। আলাহ তা‘আলা বলেছেন, আমি সূরা ফাতিহাকে আমার ও আমার বান্দার মাঝে দু’ভাগ করে নিয়েছি। আর আমার বান্দা যা চাইবে তাই পাবে। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১৮৮; সহীহ মুসলিম, হা/৯০৪।]
এ হাদীসে বলা হয়েছে, বান্দা যখন আলাহর কাছে চাইবে তখন আলাহ তাকে দেবেন। আর আমরা সবাই জানি যে, সূরা ফাতিহা হচ্ছে দু‘আ। এখন বান্দা যদি দু‘আ না করে তাহলে আলাহ তাকে কীভাবে দেবেন!
খিদাজ ( خِدَاج ) এর অর্থ : সময় আসার পূর্বেই যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, যদিও সে পূর্ণাঙ্গ হয় আরবরা ঐ বাচ্চাকে খিদাজ বলে যা রক্তপিন্ড আকারে অসময়ে গর্ভচ্যুত হয় ও যার আকৃতি চেনা যায় না। আবু ওবায়েদ বলেন, খিদাজ হলো গর্ভচ্যুত মৃত সন্তান, যা কাজে আসে না। [তিরমিযী, হা/২৪৭; আবু দাউদ, হা/৮০৬।] অতএব সূরা ফাতিহা বিহীন সালাত প্রাণহীন অপূর্ণাঙ্গ বাচ্চার ন্যায়, যা কোন কাজে লাগে না।
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ كُنَّا خَلْفَ رَسُوْلِ اللهِ فِى صَلَاةِ الْفَجْرِ فَقَرَأَ رَسُوْلُ اللهِ - فَثَقُلَتْ عَلَيْهِ الْقِرَاءَةُ فَلَمَّا فَرَغَ قَالَ : لَعَلَّكُمْ تَقْرَءُونَ خَلْفَ إِمَامِكُمْ . قُلْنَا نَعَمْ هٰذَا يَا رَسُوْلَ اللهِ . قَالَ : لَا تَفْعَلُوْا إِلَّا بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَإِنَّهٗ لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِهَا
উবাদা ইবনে সামেত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা ফজরের জামাআতে রাসূলুলাহ ﷺ এর পেছনে ছিলাম। এমন সময় মুক্তাদীদের কেউ সরবে কিছু পাঠ করলে রাসূলুলাহ ﷺ এর জন্য কিরাআত পাঠ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সালাম ফিরানোর পর রাসূলুলাহ ﷺ বললেন, সম্ভবত তোমরা তোমাদের ইমামের পেছনে কিছু পড়ে থাক? আমরা বললাম, হ্যাঁ। জবাবে রাসূলুলাহ ﷺ বললেন, এরূপ করো না। কেবল সূরা ফাতিহা ব্যতীত। কেননা যে ব্যক্তি এটা পাঠ করে না তার সালাত শুদ্ধ হয় না। [আবু দাউদ, হা/৮২৩; তিরমিযী, হা/৩১১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৭৪৬; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৫৮১; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৭৮৫; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮৭১; মিশকাত, হা/৮৫৪।]
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلّٰى بِأَصْحَابِه ، فَلَمَّا قَضٰى صَلَاتَهٗ ، أَقْبَلَ عَلَيْهِمْ بِوَجْهِهِ ، فَقَالَ : أَتَقْرَءُوْنَ فِي صَلَاتِكُمْ خَلْفَ الْإِمَامِ ، وَالْإِمَامُ يَقْرَأُ ؟ فَسَكَتُوْا ، فَقَالَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ، فَقَالَ قَائِلٌ ، أَوْ قَائِلُوْنَ : إِنَّا لَنَفْعَلُ ، قَالَ : فَلَا تَفْعَلُوْا ، وَلْيَقْرَأْ أَحَدُكُمْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فِي نَفْسِهٖ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুলাহ ﷺ সাহাবীদের নিয়ে সালাত আদায় করেন। অতঃপর যখন সালাত শেষ করলেন তখন তাদের দিকে মুখ করলেন এবং বললেন, ইমাম কিরাআত পাঠ করা অবস্থায় তোমরা সালাতে ইমামের পেছনে কিরাআত পাঠ করেছ কি? কিমত্মু তারা চুপ থাকলেন। এভাবে তিনি তিনবার জিজ্ঞেস করলেন। তখন তাদের একজন বা সকলে বললেন, হ্যাঁ-আমরা পাঠ করেছি। তখন তিনি বললেন, তোমরা এমনটি করো না। তবে তোমরা নীরবে সূরা ফাতিহা পাঠ করবে। [সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৮৪১; মু‘জামুল আওসাত, হা/২৬৮০; দার কুতনী, হা/১২৮৮।]
শাইখ আলবানী বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ লিগায়রিহী। মুহাক্কীক সালীম আসাদ বলেন, এর সনদ জাইয়িদ তথা উত্তম।
عَنْ يَزِيْدَ بْنِ شَرِيْكٍ أَنَّهٗ سَأَلَ عُمَرَ عَنِ الْقِرَاءَةِ خَلْفَ الْإِمَامِ فَقَالَ اِقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قُلْتُ وَإِنْ كُنْتَ أَنْتَ قَالَ وَإِنْ كُنْتُ أَنَا قُلْتُ وَإِنْ جَهَرْتَ قَالَ وَإِنْ جَهَرْتُ
ইয়াযীদ ইবনে শারীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা তিনি উমর (রাঃ) কে ইমামের পেছনে কিরাআত পাঠ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি শুধু সূরা ফাতিহা পাঠ করো। আমি বললাম, যদি আপনি ইমাম হন? তিনি বললেন, যদিও আমি ইমাম হই। আমি পুনরায় বললাম, যদি আপনি জোরে কিরাআত পাঠ করেন? তিনি বললেন, যদিও আমি জোরে কিরাআত পাঠ করি। [দার কুতনী, হা/১২১০; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৩০৪৭; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮৭৩।]
উপরোক্ত দলীলের ভিত্তিতে বলা যায় যে, ইমাম সূরা ফাতিহা স্বশব্দে বা নীরবে যেভাবেই পড়ুক না কেন, মুক্তাদীগণকে অবশ্যই ইমামের পেছনে নীরবে তা পড়তে হবে।
ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করা যাবে না বলে যারা অভিমত পোষণ করেন তাদের দলীল হলো; আলাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْاٰنُ فَاسْتَمِعُوْا لَهٗ وَأَنْصِتُوْا ﴾
যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয় তখন তোমরা চুপ থাকো। (সূরা আরাফ- ২০৪)
অত্র আয়াতে আলাহ তা‘আলা যেহেতু কুরআন তিলাওয়াত করার সময় চুপ থাকতে বলেছেন সেহেতু তারা যে কোন ধরনের কুরআন তিলাওয়াতের সময় চুপ থাকার পক্ষে দলীল পেশ করে থাকেন।
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুলাহ ﷺ বলেছেন, ইমাম নিযুক্ত করা হয় তাকে অনুসরণ করার জন্য। তিনি যখন তাকবীর বলেন, তখন তোমরা তাকবীর বলো। তিনি যখন কিরাআত পাঠ করেন, তখন তোমরা চুপ থাকো। [নাসাঈ, হা/৯২১; ইবনে মাজাহ, হা/৮৪৬; মিশকাত, হা/ ৮৫৭।]
এ হাদীসে বলা হয়েছে, যখন ইমাম কিরাআত পাঠ করবে তখন তোমরা নীরব থাকো।
জ্ঞাতব্য :
ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠ না করার পক্ষে যেসব দলীল পেশ করা হয় তা আম বা ব্যাপক হুকুম সম্বলিত। অন্য হাদীসের মাধ্যমে সূরা ফাতিহাকে এ হুকুম থেকে খাস করা হয়েছে। একই রাবী (আবু হুরায়রা রাঃ) এর ইতিপূর্বের বর্ণনায় এবং আনাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে সূরা ফাতিহাকে খাসভাবে চুপে চুপে পড়তে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতএব ইমামের পেছনে চুপে চুপে সূরা ফাতিহা পাঠ করলে উভয় হাদীসের উপর আমল হয়ে যায়।
ইমাম সাহেব সূরা ফাতিহা পাঠ করার সময় আয়াত শেষে যখন বিরতি দেবেন তখন মুক্তাদীরা চুপে চুপে পড়ে নেবে। আর ইমাম যখন আস্তে পড়েন তখন মুক্তাদীরা কিছুই শুনতে পায় না। এমতাবস্থায় সূরা ফাতিহা পাঠ করতে কোন সমস্যা নেই।
মুক্তাদীরা যেন সূরা ফাতিহা পাঠ করার সুযোগ পায়- সেজন্য ইমামগণের খেয়াল রাখা কর্তব্য। তাই সূরা ফাতিহা পাঠের সময় তাড়াহুড়া না করে প্রতি আয়াতে বিরতি দেবেন। যেমন রাসূলুলাহ ﷺ বিরতি দিয়ে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। আর মুক্তাদীদের উচিত হলো, ইমাম যখন পড়বেন তখন তারা শুনার দিকে মনোযোগ দিবেন। আর ইমাম যখন বিরতি দেবেন তখন চুপি চুপি ঐ আয়াতটি পড়ে নেবেন। তাহলে কুরআন শুনার উপরও আমল হবে, সেই সাথে ঐসব হাদীসের উপরও আমল হয়ে যাবে যেসব হাদীসে রাসূলুলাহ ﷺ ইমামের পেছনে চুপি চুপি সূরা ফাতিহা পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আলস্নাহ আমাদেরকে সহীহ বুঝ ও আমলের তাওফীক দান করম্নন।