পরিচ্ছেদঃ ১৮
যে কেউ কুরআন পড়বে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মানের আলামত সম্পর্কে জানতে পারবে। তাঁর সম্মানের বিষয়টিও আল্লাহ-রাসূল কর্তৃক নির্ধারিত। এটাকে আল্লাহ মানুষের রুচি বা ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দেন নি।
প্রথম আলামত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজকে সম্মান করা। সেহেতু তাঁর কথার ওপর কারোও কথা কিংবা তাঁর কাজের ওপর অন্য কারও কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُقَدِّمُواْ بَيۡنَ يَدَيِ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٞ ١ ﴾ [ الحجرات : ١ ]
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ”। [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১]
দ্বিতীয় আলামত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজের অনুকরণ করা। সেহেতু তাঁর কথার বিপরীতে অন্য কারোও কথা কিংবা তাঁর কর্মপন্থার বিপরীতে অন্য কারও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ না করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا ٣٦﴾ [ الاحزاب : ٣٦ ]
‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না, আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে”। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৬]
তৃতীয় আলামত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ সর্বাংশে সম্মান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ ٦٣﴾ [ النور : ٦٣ ]
“অতএব, যারা তাঁর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন তাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসা অথবা যন্ত্রণাদায়ক ‘আযাব পৌঁছার ভয় করে”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬৩]
চতুর্থ আলামত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিষেধ সর্বাংশে সম্মান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ يَوۡمَئِذٖ يَوَدُّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ وَعَصَوُاْ ٱلرَّسُولَ لَوۡ تُسَوَّىٰ بِهِمُ ٱلۡأَرۡضُ وَلَا يَكۡتُمُونَ ٱللَّهَ حَدِيثٗا ٤٢﴾ [ النساء : ٤٢ ]
“সেদিন আশা করবে যারা কুফুরী করেছিল এবং রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল, যদি যমীন তাদের নিয়ে সমান হয়ে যেতো, আর তারা আল্লাহর কাছে কোনো কথাই লুকাবে না”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪২]
আরও বলেন,
﴿وَيَوۡمَ يَعَضُّ ٱلظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيۡهِ يَقُولُ يَٰلَيۡتَنِي ٱتَّخَذۡتُ مَعَ ٱلرَّسُولِ سَبِيلٗا ٢٧﴾ [ الفرقان : ٢٦ ]
“সেদিন যালেম ব্যক্তি তার হাত কামড়াতে কামড়াতে বলতে থাকবে, হায় যদি রাসূলের সাথে কোনো পন্থা অবলম্বন করতাম!” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২৭]
তিনি আরও বলেন,
﴿وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ﴾ [ الحشر : ٧ ]
‘আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত হও।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭]
পঞ্চম আলামত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস বা বাক্যোচ্চারণকে সম্মান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَرۡفَعُوٓاْ أَصۡوَٰتَكُمۡ فَوۡقَ صَوۡتِ ٱلنَّبِيِّ﴾ [ الحجرات : ٢ ]
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা নবীর আওয়াজের ওপর তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না”। [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ২]
ষষ্ঠ আলামত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতকে সম্মান করা এবং দৃঢ়ভাবে তা আঁকড়ে ধরা। ‘ইরবাদ ইবন সারিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ يَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّهَا ضَلَالَةٌ فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنْكُمْ فَعَلَيْهِ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ»
“(আমার পরে) তোমাদের যে কেউ বেঁচে থাকবে, সে অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। তোমরা নব আবিষ্কৃত ধর্মীয় বিষয় থেকে সাবধান, কারণ তা পথভ্রষ্টতা। তোমাদের যে কেউ এ যুগ পাবে, তার কর্তব্য হবে আমার এবং হিদায়াত ও সুপথপ্রাপ্ত খলীফাদের আদর্শ অবলম্বন করবে এবং তা দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধরবে”। [তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৬।]
সপ্তম আলামত: যখনই তাঁর নাম নিজে উচ্চারণ করা হবে বা অন্য কাউকে উচ্চারণ করতে শোনা যাবে, তাঁর ওপর দুরূদ পড়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِيِّۚ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيۡهِ وَسَلِّمُواْ تَسۡلِيمًا ٥٦﴾ [ الاحزاب : ٥٦ ]
“নিশ্চয় আল্লাহ (ঊর্ধ্ব জগতে ফিরিতাদের মধ্যে) নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফিরিশতাগণ নবীর জন্য দো‘আ করে। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর ওপর দুরূদ পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও”। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৬]
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ »
“ঐ ব্যক্তির নাক ধূলি ধূসরিত হোক যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয় আর তখন সে আমার ওপর সালাত পাঠ করে না”। [তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৫।]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সালাত কীভাবে পাঠ করতে হবে তা অহীর মাধ্যমেই শেখানো হয়েছে। একে মানুষের মর্জি বা রুচির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় নি। আবূ মাসঊদ আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,
«أَتَانَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ فِي مَجْلِسِ سَعْدِ بْنِ عُبَادَةَ، فَقَالَ لَهُ بَشِيرُ بْنُ سَعْدٍ : أَمَرَنَا اللهُ تَعَالَى أَنْ نُصَلِّيَ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ، فَكَيْفَ نُصَلِّي عَلَيْكَ؟ قَالَ : فَسَكَتَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، حَتَّى تَمَنَّيْنَا أَنَّهُ لَمْ يَسْأَلْهُ ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «قُولُوا اللهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ فِي الْعَالَمِينَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَالسَّلَامُ كَمَا قَدْ عَلِمْتُمْ»
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের সম্মুখে আগমন করলেন যখন আমরা সা‘দ ইবন উবাদার মজলিসে বসা ছিলাম। তখন তাঁর উদ্দেশ্যে বাশীর ইবন সা‘দ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তা‘আলা তো আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আপনার ওপর দরূদ পড়তে; আপনার ওপর আমরা কীভাবে দরূদ পড়ব?’ তিনি বললেন, বলো: (উচ্চারণ) ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিঁও ওয়া‘আলা আ-লি মুহাম্মাদ কামা সাল্লাইতা ‘আলা ইবরাহীমা ওয়া‘আলা আ-লি ইবরাহীম ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ; আল্লাহুম্মা বা-রিক ‘আলা মুহাম্মাদিঁও ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদ কামা বা-রাকতা ‘আলা ইবরাহীমা ওয়া ‘আলা আ-লি ইবরাহীম ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।’