আল্লামা নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান ভুপালী। ইলমী দিগন্তের এক কালপুরুষ। ইতিহাসের এক অমর ব্যক্তিত্ব। সালফে-সালেহীনের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তাওহীদ-সুন্নাহর অকুণ্ঠ প্রচারক এবং শিরক-বিদআতের মূলোৎপাটনে এক সংগ্রামী সিপাহসালার।
হিজরি ১৩০০ শতাব্দীর শেষ দিকে ভারত উপমহাদেশে যে ইলমের বিপ্লব সাধিত হয়েছিল এ ক্ষেত্রে আল্লাহর পরে তার অবদানকেই সব চেয়ে বেশী বলে গণ্য করা হয়। কেননা, তিনি ইলমের ময়দান থেকে ভূপালের রাজ সিংহাসনে আরোহণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন এবং নিজস্ব জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কুরআন-সুন্নাহ এবং বিশুদ্ধ আকীদা নির্ভর শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে শুধু ভারত উপামহাদেশ নয় বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
আরবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বহু থিসিস রচিত হয়েছে। অনেক গবেষক তার জীবনী নিয়ে গবেষণা করেছেন ও গ্রন্থ রচনা করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি হল,
১) বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আব্দুর রাযযাক দায়লামী ১৯৯৩ সনে রচনা করেছেন সিদ্দীক হাসান খান কান্নুজী এবং তার রচিত ‘ফাতহুল বায়ান ফী মাকাসিদিল কুরআন’ শীর্ষক তাফসীর গ্রন্থের উপর একটি সন্দর্ভ।
২) কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আহমদ বিন মুহাম্মদ আল হামাদী ১৯৮৭ সালে থিসিস রচনা করেছেন তাফসীরের ক্ষেত্রে সিদ্দীক হাসান খান এর মূলনীতির উপরে।
৩) ডক্টর আহমদ মুহাম্মদ আখতার খান সিদ্দীক হাসান খান এর আকীদা-বিশ্বাসের উপর থিসিস রচনা করেছেন।
৪) ডক্টর আলী আল আহমদ থিসিস রচনা করেছেন দাওয়াত ও ইহতিসাব তথা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ এর ক্ষেত্রে সিদ্দীক হাসান খান এর অবদান বিষয়ে।
৫) ডক্টর রাজিয়া হামিদ তার জীবনীর উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন।
৬) সিদ্দীক হাসান খান এর জীবনীর উপর শাইখ আব্দুল হামীদ রহমানীর এর লেখা প্রবন্ধ ধারাবাহিকভাবে ভারতের জামিয়া সালাফিয়ার ম্যাগাজিন এ প্রকাশিত হয়েছে।
৭) এ ছাড়াও তার জীবনীর উপরে ডক্টর শাইখ মহিউদ্দীন আলওয়ায়ীর লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনে (৪৭ ও ৪৮তম সংখ্যায়)।
৮) আল্লামা মুহাম্মদ ইজতিবা নদভী তার জীবনীর ব্যাপারে মূল্যবান বই লিখেছেন। এটি তার জীবনীর ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো রচনা।
কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এই মনিষী আমাদের খুব কাছের মানুষ হওয়া স্বত্বে বাংলা ভাষায় তার আলোচনা খুব অপ্রতুল। যার কারণে এমন একজন জ্ঞানতাপস কালক্রমে আমাদের স্মৃতি থেকে হারাতে বসেছে! আমাদের ছাত্ররা এমন কি অনেক আলেমও তার সম্পর্কে তেমন ওয়াকিফহাল নন!
তাই আমি মনে করি, ইতিহাসের ক্ষণজন্মা এই মনিষীর জীবন চরিত সম্পর্কে গবেষণা ও আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে তাঁর মূল্যবান গ্রন্থাদি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা দরকার। তাতে আমাদের জ্ঞান জগত আরও সমৃদ্ধ হবে। কুরআন-সুন্নাহ ও বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস নির্ভর জ্ঞানের প্রসার ঘটবে। সেই সাথে বিশুদ্ধ ইলম চর্চার দৈন্যতার এ যুগে তার জীবনী শিক্ষানবিশ, লেখক, গবেষক, অনুবাদক, বক্তা, আলেম, ওয়েয এমন কি রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারের বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আলো ছাড়াবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
এখানে আমরা দেখতে পাব-
কিভাবে একজন আলেম সকল গোঁড়ামি পরিহার করে মাযহাবী অন্ধভক্তির বেড়াজাল ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন।
কিভাবে একজন আলেম সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে ইলমের খেদমতে নিয়োজিত থেকেছেন। তার ঐতিহাসিক হজ্জ সফর সময়কে কাজে লাগানোর এবং ইলম চর্চার ক্ষেত্রে এক অনবদ্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
কিভাবে একজন আলেম রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে কাজ করে সততা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
কিভাবে একজন আলেম রাষ্ট্র পরিচালনা করে ইতিহাসের পাতায় অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছেন। যদিও হিংসুক, চোগলখোর,শিরক ও বিদআতের পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত একশ্রেণীর মানুষের মাধ্যমে তিনি ষড়যন্ত্র ও অনেক অন্যায় আচরণের শিকার হয়েছেন। এমন কি শেষ পর্যন্ত তাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে দূরে সরতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও দাওয়াত ও ইলমের ময়দানের তিনি যে স্বাক্ষর রেখে গেছেন তার নজির খুব কম পাওয়া যায়। তার রচিত শতাধিক গ্রন্থ এ কথার উজ্জ্বল প্রমাণ বহণ করে।
উপরোক্ত কারণে, এই মনিষীকে বাংলাভাষী মানুষের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আমার এই সামান্য প্রয়াস। এতে হয়ত তার ব্যাপারে বাংলাভাষী গবেষকদের সামনে গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হবে।
সম্মানিত পাঠক পাঠিকার নিকট অনুরোধ জানাবো, কোথাও তথ্যগত,বানানগত বা অন্য কোন বিষয়ে বিভ্রাট পরিলক্ষিত হলে হলে আমাকে জানাবেন যাতে পরবর্তীতে তা সংশোধন করে নিতে পারি।
পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে দুয়া করি,আল্লাহ তাআলা যেন দ্বীনের খেদমতে আল্লামা সিদ্দীক হাসান এর অবদানগুলো কবুল করে নেন এবং তাকে এর সর্বোত্তম বিনিময় দান করেন। সর্বোপরি ক্ষমা ও দয়ার চাদরে পরিবেষ্টন করে সুউচ্চ জান্নাতুল ফিরদউসে স্থান দান করেন। আমীন।
বিনীত নিবেদক
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব
তারিখ: ১৬-০৮-২০১৬ইং
MOB NO:+966571709362
[email protected]https://salafibd.files.wordpress.com