পরিচ্ছেদঃ ৪
দ্বিতীয়ত: হাদিস থেকে:
হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«الناس معادن كمعادن الذهب و الفضة خيارهم في الجاهلية خيارهم في الإسلام إذا فقهوا» .
“মানুষ মূল্যবান ধাতুর ন্যায়, স্বর্ণ-রৌপ্যের মতো। জাহেলী যুগের ভাল মানুষেরা ইসলামী যুগেও ভালো মানুষ। যদি তারা বুঝে।” (সহীহ মুসলিম)
দেখুন! এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে মানুষের ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। মানুষকে তিনি স্বর্ণ-রৌপ্যের ন্যায় মূল্যবান ধাতু বলে উল্লেখ করেছেন।
কখনো কখনো মানুষের জীবনে বিপদ আসে। অধিকাংশ মানুষ বিপদকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। আবার যখন সুখের দিন আসে মানুষ সেটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন, সুখ-দুঃখ উভয় অবস্থাই মানুষের জন্য ইতিবাচক। প্রত্যক্ষভাবে কিংবা পরোক্ষভাবে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ঈমানদারের বিষয়টি আশচর্যজনক। তার সকল কাজই কল্যাণকর। ঈমানদার ছাড়া অন্য কোনো মানুষের এ সৌভাগ্য নেই। তার যদি আনন্দ বা সুখকর কোনো বিষয় অর্জিত হয়, তাহলে সে আল্লাহর শোকর করে, ফলে তার কল্যাণ হয়। আর যদি তাকে কোনো বিপদ-মুসীবত স্পর্শ করে, তাহলে সে ধৈর্য ধরে, এতেও তার কল্যাণ হয়।” (সহীহ মুসলিম)
তিনি আরো বলেছেন,
«لا تحقرن من المعروف شيئا» .
“যা কিছু ভালো, তা যত ছোটই হোক, তুমি কখনো তা অবমূল্যায়ন করো না।”
দেখুন কীভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব বিষয়কে নিজের জন্য ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করার জন্য ঈমানদারদের দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন।
আরো একটি চমৎকার উদাহরণ দেখুন!
আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«خرج رجلان في سفر فحضرت الصلاة، وليس معهما ماء، فتيمما صعيدا طيبا فصليا، ثم وجد الماء في الوقت، فأعاد أحدهما الصلاة والوضوء، ولم يعد الآخر ثم أتيا رسول الله صلى الله عليه وسلم فذكرا ذلك له فقال للذي لم يعد : أصبت السنة وأجزأتك صلاتك، وقال للآخر : لك الأجر مرتين» . رواه أبو داود والنسائي
“দু ব্যক্তি সফরে গেল। সালাতের সময় যখন উপস্থিত হলো, তখন তাদের কাছে অজু করার মতো পানি ছিল না। উভয়ে মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করল। এরপর পানি পেল। তখন একজন অজু করে সালাত পুনরায় আদায় করল। অন্যজন পুনরায় সালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকল। এরপর উভয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে ঘটনার বিবরণ দিল। যে সালাত পুনরায় আদায় করল না, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি সুন্নাত মতো কাজ করেছ। তোমার সালাত আদায় হয়েছে।" আর যে পুনরায় সালাত আদায় করেছে তাকে তিনি বললেন, "তোমার জন্য আছে দ্বিগুণ পুরস্কার।"
দেখুন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়ের ব্যাপারে কীভাবে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিলেন। অথচ উভয়ে ছিল পরস্পর-বিরোধী অবস্থানে। আমরা এ অবস্থা দেখে কোনটা সঠিক মন্তব্য করতে না পারলেও বলতাম, অবশ্যই একটি সঠিক হবে, আর অন্যটি হবে ভ্রান্ত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়টিকেই স্বীকৃতি দিলেন। আর সঠিক কোনটি তার প্রতি ইঙ্গিতও করলেন। দাওয়াত-কর্মী ও আলেমদের, এ বিষয়টি রাসূলের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা খুবই জরুরি।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত একশ মানুষ খুন করার তাওবাহ সম্পর্কিত একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে দেখা যায় যে, খুনী ব্যক্তি নিরানব্বই জনকে খুন করার পর একজন আবেদকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘‘আমার তাওবা করার সুযোগ আছে কি না?’ উত্তরে সে বলেছিল, ‘‘তাওবার সুযোগ নেই।” অতঃপর তাকেও সে খুন করল। পরে একজন আলেমকে খুনীব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ‘‘তাওবা করার সুযোগ আছে কি না।” সে বলল, হাঁ, তাওবার সুযোগ আছে। দেখা গেল প্রথম জনের উত্তর ছিল নেতিবাচক আর দ্বিতীয়জনের উত্তর ছিল ইতিবাচক। দ্বিতীয় ব্যক্তির উত্তরটি আল্লাহর কাছে সঠিক ছিল।
ইজতেহাদ বা গবেষণানির্ভর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিভঙ্গি দেখুন। তিনি বলেছেন, গবেষক যদি গবেষণায় ভুল সিদ্ধান্ত দেন তাহলে তার জন্য পুরস্কার একটি। আর যদি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান তা হলে তার পুরস্কার দুটি। ইজতিহাদ বা গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি কত বড় ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। প্রথমত তিনি গবেষণাকে উৎসাহিত করেছেন, দ্বিতীয়ত সঠিক ও নির্ভুল গবেষণা করতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি যদি বলতেন, ‘‘সাবধান, গবেষণা একটি কঠিন কাজ। তোমরা যারা ইজতিহাদ করবে তারা যদি ভুল করো তাহলে কঠোর আযাব দেয়া হবে।” তাহলে আমরা বলতাম, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথার্থই বলেছেন। আর এভাবে বললে, কোনো কিছু নিয়ে মানুষ গবেষণা করতে উৎসাহ পেত না। কিন্তু তিনি ছিলেন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। এ জাতীয় উদাহরণ হাদীসে বহুল পরিমাণে পাওয়া যাবে।