পরিচ্ছেদঃ ৬২
৬১. ইমাম, মাযহাব বা দলের দোহাই দিয়ে সহীহ হাদীসের উপর আমল না করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
অনেক মানুষ মাযহাবের মতের বিপরীত হলে অনেক ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ হাদীস পরিত্যাগ করেন। কারণ, ঐ হাদীসটিকে মেনে নেয়ার মানেই হলো এ কথা স্বীকার করে নেয়া যে, তার মাযহাবের ইমাম সিদ্ধামত্ম প্রদানের ক্ষেত্রে ভুল করেছেন। আর তাদের মতে এরূপ চিমত্মাধারা বেয়াদবি।
অথচ রাসূলুলস্নাহ ﷺ ব্যতীত অন্য যেকোন মানুষের কথা গৃহীত হতে পারে আবার পরিত্যাজ্যও হতে পারে। সুতরাং যদি কেউ এমন মতামত পেশ করে যা সহীহ হাদীস বিরোধী, তাহলে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। রাসূলুলস্নাহ ﷺ এর বক্তব্যের উপর ইমামের মতকে প্রাধান্য দেয়া স্বয়ং ইমামদের অবস্থানেরই সম্পূর্ণ বিপরীত।
এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর কিছু কথা এখানে উলেস্নখ করা হলো। কথাগুলো হচ্ছে,
إِذَا صَحَّ الْحَدِيْثُ فَهُوَ مَذْهَبِيْ
১. হাদীস যখন সহীহ হবে সেটাই হবে আমার মাযহাব। অর্থাৎ যখন কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যাবে তখন সেটাই আমার মতামত বলে বিবেচিত হবে। [রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৬২ পৃঃ; ফতওয়ায়ে শামী, ১/৪৬ পৃঃ।]
لَا يَحِلُّ لِاَحَدٍ اَنْ يَّأْخُذَ بِقَوْلِنَا مَا لَمْ يَعْلَمْ مِّنْ أَيْنَ أَخَذْنَاهُ
২. আমরা কোথা থেকে কথাটি নিলাম এটা না জানা পর্যমত্ম কারো জন্য আমাদের কথা গ্রহণ করা বৈধ নয়। [বাহরুর রায়িক ৬/২৯৩ পৃঃ, মুকাদ্দমাতুল হেদায়াহ, ১/৯৩ পৃঃ।]
حَرَامٌ عَلٰى مَنْ لَّمْ يَعْرِفْ دَلِيْلِيْ اَنْ يُّفْتِيَ بِكَلَامِيْ
৩. যে আমার কথার প্রমাণ জানে না তার পক্ষে আমার কথার দ্বারা ফতওয়া প্রদান করা হারাম। [আস সালাফিয়্যুন ওয়াল আইম্মাহ, ১/২৯ পৃঃ; হুজ্জাতুলস্নাহিল বালিগাহ, হা/১/৩৩১।]
وَيْحَكَ يَا يَعْقُوْبُ ( هُوَ أَبُوْ يُوْسُفَ ) لَا تَكْتُبْ كُلَّ مَا تَسْمَعُ مَتٰى فَإِنِّيْ قَدْ أَرٰى الرَّأْيَ الْيَوْمَ وَأَتْرُكُهٗ غَدًا وَأَرٰى الرَّأْيَ غَدًا وَأَتْرُكُهٗ بَعْدَ غَدٍ
৪. হে হতভাগা ইয়াকুব! (আবু ইউসুফ) তুমি আমার থেকে যা শোন তা লেখো না, কেননা আমি আজ এক মত পোষণ করি আর আগামীকাল তা পরিহার করি। আবার আগামীকাল এক মত পোষণ করি আর পরশুদিন তা পরিত্যাগ করি। [সুনানে দারেমী, হা/১৯৭; তারীখে বাগদাদ ৭/৪০৩ পৃষ্ঠা।]
اِذَا قُلْتُ قَوْلًا يُخَالِفُ كِتَابَ اللهِ تَعَالٰى وَخَبَرَ الرَّسُوْلِ فَاتْرُكُوْا قَوْلِيْ
৫. যখন আমি এমন কথা বলি, যা আলস্নাহ তা‘আলার কিতাব ও রাসূলুলস্নাহ ﷺ এর হাদীস বিরোধী তাহলে তোমরা আমার কথা পরিত্যাগ করবে। [ইকাযু হুমামি উলিল আবসার- ১/৬২।]
سُئِلَ اَبُوْ حَنِيْفَةَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالٰى اِذَا قُلْتَ قَوْلًا وَكِتَابُ اللهِ يُخَالِفُهٗ قَالَ اَتْرُكُوْا قَوْلِيْ بِكِتَابِ اللهِ فَقِيْلَ اِذَا كَانَ خَبْرُ رَسُوْلِ اللهِ يُخَالِفُهٗ قَالَ اُتْرُكُوْا قَوْلِيْ بِخَبْرِ رَسُوْلِ اللهِ فَقِيْلَ اِذَا كَانَ قَوْلُ الصَّحَابَةِ يُخَالِفُهٗ قَالَ اُتْرُكُوْا قَوْلِيْ بِقَوْلِ الصَّحَابَةِ
৬. ইমাম আবু হানীফা (রহ.) কে বলা হলো আপনি যখন কোন কথা বলেন, আর পবিত্র কুরআন তার বিরোধী হয় তাহলে কী করা হবে? তিনি উত্তরে বললেন, আপনারা কুরআনের মোকাবেলায় আমার কথা প্রত্যাখ্যান করম্নন। তারপর বলা হলো, আপনার কথা যদি হাদীসের বিরোধী হয়? তখন উত্তর দিলেন, রাসূলুলস্নাহ ﷺ এর হাদীসের মোকাবেলায় আমার কথা পরিহার করম্নন। তারপর জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার কথা যদি সাহাবীগণের কথার বিরোধী হয়? তখন উত্তর দিলেন, সাহাবীগণের কথার মোকাবেলায় আমার কথা পরিত্যাগ করম্নন। [ঈকদুল জীদ, ৫৩ পৃঃ।]
اِذَا قُلْتُ قَوْلًا فَاَعرِضُوْا عَلٰى كِتَابِ اللهِ رَسُوْلِه فَاِنْ وَافَقَهُمَا فَاقْبَلُوْهُ وَمَا خَالَفَهُمَا فَرُدُّوْهُ وَاضْرِبُوْا بِقَوْلِيْ عَرَضَ الْحَائِطِ
৭. আমি যখন কোন কথা বলি তা পবিত্র কুরআন ও রাসূলুলস্নাহ ﷺ এর হাদীসের সাথে যাচাই করো। যদি ঐ দুটির সাথে আমার কথা মিলে, তাহলে গ্রহণ করো। আর যদি বিরোধী হয়, তাহলে প্রত্যাখ্যান করো ও দেয়াল পৃষ্ঠে নিক্ষেপ করো। [হুজ্জাতুলস্নাহিল বালিগাহ, ১/১৬৩ পৃঃ ; মীযানে কুবরা, ১/৫৭ পৃঃ।]
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর নিকট কোন সমস্যার সমাধানের জন্য গেলে তার নিকট সে বিষয়ের হাদীস বিদ্যমান না থাকলে তিনি ফতওয়া দিয়ে বলতেন,
هٰذَا رَأْيُ النُّعْمَانِ بْنِ ثَابِتٍ يَعْنِيْ نَفْسَهُ وَهُوَ أَحْسَنُ مَا قَدَرْنَا عَلَيْهِ فَمَنْ جَاءَ بِأَحْسَنَ مَنْهُ فَهُوَ أَوْلٰى بَالصَّوَابِ
৮. এটা নু‘মান বিন সাবিতের সিদ্ধামত্ম। আমাদের ক্ষমতা অনুসারে এটাই সর্বোৎকৃষ্ট উক্তি। কিন্তু যদি কেউ এটা অপেক্ষা অধিক বলিষ্ঠতর সিদ্ধামেত্ম উপনীত হতে সক্ষম হয় তাহলে সে সিদ্ধামত্মই সঠিক। [হুজ্জাতুলস্নাহিল বালিগাহ, ১৬২ পৃঃ ; মীযানুল কুবরা, ১/৬০ পৃঃ।]
তিনি আরো বলতেন, যদি দলীল পেশ হয়ে যায় তাহলে তোমরা তদানুযায়ী কথা বলবে। [রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৭ পৃঃ।]
اِيَّاكُمْ وَالْقَوْلَ فِيْ دِيْنِ اللهِ بِالرَّأْيِ وَعَلَيْكُمْ بِاتِّبَاعِ السُّنَّةِ فَمَنْ خَرَجَ عَنْهَا ضَلَّ
৯. সাবধান! তোমরা আলস্নাহর দ্বীনে নিজেদের অভিমত প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকো। সকল অবস্থাতেই সুন্নাহর অনুসরণ করো। যে ব্যক্তি সুন্নাহ থেকে বের হবে, সে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। [মীযানুল কুবরা, ১/৯ পৃঃ।]
وَاَصْحَابُ اَبِيْ حَنِيْفَةَ رَحِمَهُ اللهُ مُجْمِعُوْنَ عَلٰى اَنَّ مَذْهَبَ اَبِيْ حَنِيْفَةَ اَنَّ ضَعِيْفَ الْحَدِيْثِ عِنْدَهٗ أَوْلٰى مِنَ الْقِيَاسِ وَالرَّأْيِ
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর সকল অনুসারীরা এ ব্যাপারে একমত যে, যঈফ বা দুর্বল হাদীস ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর কাছে কিয়াস ও তাঁর অভিমতের চেয়েও অনেক উত্তম। [ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন- ১২/৮২ পৃঃ।]
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর এ মনোভাব ছাত্রদেরকে তার মতের অন্ধ অনুসরণ করা থেকে বিরত রেখেছে এবং নিজেদের পাশাপাশি অপরের মতামতকেও শ্রদ্ধা করার মানসিকতা সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তার নিজের ও তার ছাত্রদের মতামত অন্ধভাবে অনুসরণ করার বিরম্নদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তিনি ও তার ছাত্রবৃন্দ কোন্ মূলনীতি বা প্রমাণের আলোকে মত দিয়েছেন তা না জেনে তিনি সে মতের অন্ধ অনুসরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
আবু হানীফা (রহ.) তার সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে সব সময়ই সজাগ ছিলেন। তাই তিনি তার ছাত্রবৃন্দ ও অন্যদের কাছে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন যে, সঠিক ও ভুলের চূড়ামত্ম মানদন্ড হলো কুরআন ও সুন্নাহ। যা কিছু এর সাথে সংগতিপূর্ণ তা-ই সঠিক, আর যা কিছু সংগতিপূর্ণ নয় তা-ই ভুল।
ইমামগণের ছাত্ররা কী করতেন?
মহান ইমামগণ তাদের ছাত্রদেরকে অন্ধ অনুসরণের ব্যাপারে কাঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। এ কারণে তারা কোন বিষয়ে নতুন কোন হাদীস জানতে পারলে নিজ শিক্ষকের মতের বিপরীত সিদ্ধামত্ম গ্রহণ করতে কখনো দ্বিধা করতেন না। কারণ ইমামগণ তাদের এমনটি করারই নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর সাথে তারই ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ প্রায় এক তৃতীয়াংশ সিদ্ধামেত্মর ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। [আল-হাশিয়্যাহ, ১/৬২ পৃঃ।]
ইমাম ইবনে ইউসুফ আল বালাখি ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আল-হাসানের ছাত্র এবং আবু ইউসুফের ঘনিষ্ঠ অনুসারী। তিনি অনেক ক্ষেত্রেই আবু হানীফা ও তার এই দুই ছাত্রের সিদ্ধামত্ম থেকে ভিন্নমত দিয়েছেন। কারণ কিছু বিষয়ের প্রমাণ তাদের কাছে পৌঁছায়নি, কিন্তু পরবর্তীকালে ইবনে ইউসুফ আল বালাখি সেগুলো জানতে পেরেছিলেন। [রাসমুল মুফতী, ১/২৭ পৃঃ।]
একইভাবে আল মুযানি ও অন্যান্য ছাত্রবৃন্দ অনেক সিদ্ধামেত্মর ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষক ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এর সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
প্রধান চার ইমাম ও তাদের ছাত্রবৃন্দ সুন্নার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের দাবি করেছেন এবং তাদের ব্যক্তিগত মতের অন্ধ অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। তাদের বক্তব্য একেবারেই স্পষ্ট এবং যুক্তিযুক্ত। এগুলোর অপব্যাখ্যা করার কোন অবকাশ নেই।
সুন্নার অনুসরণ করতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে কোন ইমামের মতের বিপরীত হয়ে যেতে পারে। এর দ্বারা কেউ ইমামের বিরম্নদ্ধে গিয়েছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। কেবল ইমামদের মতের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে নির্ভরযোগ্য হাদীসকে পরিত্যাগ করা হলে তা হবে স্বয়ং ইমামদের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। অধিকমত্মু নির্ভরযোগ্য হাদীস প্রত্যাখ্যান সরাসরি আলস্নাহ ও তার রাসূলের বিরম্নদ্ধাচরণের নামামত্মর। আলস্নাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করম্নন আমীন!!
দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা ফরজ
ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুলস্নাহ ﷺ বলেছেন, ইলম বা জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয। (ইবনে মাজাহ, হা/২২৪)