পরিচ্ছেদঃ ৯
ছয়: ফজরের পূর্বে আযান ও তার বিধান
কিছু শর্ত রয়েছে যার সম্পর্ক আযানের সাথে, আর কিছু শর্ত রয়েছে যার সম্পর্ক মুয়াজ্জিনের সাথে, নিচে তার বর্ণনা দেওয়া হলো:
১. ধারাবাহিকভাবে আযান দেওয়া, অর্থাৎ প্রথমে তাকবীর বলা, অতঃপর শাহাদাত, অতঃপর হাইআলাহ, অতঃপর তাকবীর, অতঃপর কালেমা তাওহীদ বলা, যদি আযান বা ইকামত উলট-পালট বলে, তাহলে শুদ্ধ হবে না। কারণ, আযান একটি ইবাদাত, যেভাবে তা প্রমাণিত, সেভাবে তা আদায় করা ওয়াজিব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«من عمل عملاً ليس عليه أمرنا فهو ردٌّ» .
“যে ব্যক্তি এমন আমল করল, যার ওপর আমাদের আদর্শ নেই, তা পরিত্যক্ত”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭১৮।]
২. আযানের শব্দগুলো পরপর বলা, দুই বাক্যের মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি না নেওয়া, যদি হাঁচি চলে আসে, তাহলে পূর্বের বাক্যের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী বাক্য বলা। কারণ, এ বিরতি অনিচ্ছাকৃত।
৩. সালাতের সময় হলে আযান দেওয়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إذا حضرت الصلاة فليؤذن لكم أحدكم»
“যখন সালাতের সময় হয়, তখন যেন তোমাদের কেউ আযান দেয়”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৭৪।] আর ফজরের পূর্বের আযান ফজর সালাতের জন্য নয়, বরং সেটা ঘুমন্ত ব্যক্তিদের জাগ্রত করা ও দণ্ডায়মান ব্যক্তিদের বাড়িতে ফিরানোর জন্য।
৪. আযানে এমন সূর গ্রহণ করা যাবে না, যা শব্দ ও অর্থ বিকৃতি করে দেয়, যা আরবি ব্যাকরণের বিপরীত। যেমন কেউ বলল الله أكبار، তাহলে বৈধ হবে না। কারণ, এটা অর্থ বিকৃতি করে দেয়। [ইবন উসাইমীন রহ. বলেন: ভুল দুই প্রকার: এক প্রকার রয়েছে, যে কারণে আযান শুদ্ধ হয় না, যেখানে অর্থের বিকৃতি ঘটে। যেমন, কেউ বলল: ( الله أكبار ) কারণ ( أكبار ) শব্দ ( كَبَر ) এর বহু বচন, যার অর্থ তবলা বা ঢোল। যেমন سبب এর বহু বচন أسباب আরেক প্রকার ভুল রয়েছে, যে কারণে অর্থ পরিবর্তণ হয় না, যেমন: (( اللهَ أكبر )) জবর দ্বারা পড়া, আরো যেমন: (( حيًّا على الصلاة )) বলা। দেখুন: শারহুল মুমতি: (২/৬৯,৬০-৬২)।]
৫. উচ্চ স্বরে আযান দেওয়া। কারণ, মুয়াজ্জিন যদি এমন আস্তে আযান দেয় যে, সে নিজে ব্যতীত কেউ না শোনে, তাহলে আযান বৈধ করণের কোনো মানে থাকে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেন তোমাদের জন্য আযান দেয়”। [বুখারি ও মুসলিম।] এ থেকে বুঝা যায় যে, আযান উচ্চ স্বরে দিতে হবে যেন অন্যরা শুনতে পায়, তাহলে মানুষকে শোনানোর উদ্দেশ্য হাসিল হবে, তবে উপস্থিত লোকদের জন্য আযান দিলে ভিন্ন কথা, কিন্তু সেখানেও উচ্চ স্বরে আযান দেওয়া উত্তম। আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফূ‘ হাদীসে বর্ণিত আছে:
«.. فإذا كنت في غنمك أو باديتك فأذَّنْتَ فارفع صوتك بالنداء؛فإنه لا يسمع مدى صوتِ المؤذن جنٌّ ولا إنسٌّ،ولا شيء إلا شهد له يوم القيامة» .
“যখন তুমি তোমার বকরির পাল অথবা মরুভূমিতে থাক, তখন আযান দিলে উচ্চ স্বরে দিবে। কারণ, মুয়াজ্জিনের আওয়াজ যে কেউ শুনবে, জিন-মানুষ বা অন্য কোনো বস্তু, তারা মুয়াজ্জিনের জন্য কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দিবে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০৯।]
৬. সুন্নত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যা মোতাবেক আযান দিবে, তাতে কম বা বেশি করবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«من عمل عملاً ليس عليه أمرنا فهو رد» .
“যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ওপর আমাদের আদর্শ নেই, তা পরিত্যক্ত”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৮।]
৭. এক ব্যক্তির আযান দিতে হবে, দুই জনের আযান শুদ্ধ নয়। যদি এক ব্যক্তি আযান আরম্ভ করে, অতঃপর অপর ব্যক্তি তা পুরো করে, তাহলে আযান শুদ্ধ হবে না।
৮. মুয়াজ্জিন আযানের নিয়ত করে আযান দিবে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিয়তের ওপর আমল নির্ভর করে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯০৭।]
৯. মুয়াজ্জিনের মুসলিম হওয়া জরুরি, যদি কোনো কাফের আযান দেয় তাহলে শুদ্ধ হবে না। কারণ, সে ইবাদতের উপযুক্ত নয়।
১০. মুয়াজ্জিনের বুঝমান হওয়া জরুরি, যার বয়স সাত থেকে সাবালক পর্যন্ত, যে কথা বুঝে ও উত্তর দিতে পারে, তার নিকট কোনো বস্তু চাওয়া হলে সে উপস্থিত করতে পারে।
১১. মুয়াজ্জিনের বিবেকবান হওয়া জরুরি, পাগলের আযান শুদ্ধ নয়।
১২. মুয়াজ্জিনের পুরুষ হওয়া জরুরি, নারীদের আযানের কোনো গ্রহণ যোগ্যতা নেই। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, “নারীদের ওপর আযান ও ইকামত কিছু নেই”। [বায়হাকী: (১/৪০৮)।] নারীরা আযানের উপযুক্ত নয়, দ্বিতীয়ত আযান উচ্চ স্বরে দিতে হয়, আর নারীদের আওয়াজ উঁচু করা নিষেধ। [মানারুস সাবিল: (১/৬৩); শারহুল মুমতি: (২/৬১)।]
১৩. নীতিবান হওয়া জরুরি, যদিও বাহ্যিকভাবে হয়। কারণ, আযান ইবাদত, বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী আযান ইকামত থেকে উত্তম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজ্জিনদের আমানতদার বলেছেন, আর ফাসেক আমানতদার নয়। যেমন, হাদীসে এসেছে:
«أمناء الناس على صلاتهم وسحورهم المؤذنون» .
“মানুষের সালাত ও সাহরীর আমানতদার হচ্ছে মুয়াজ্জিনগণ”। [বায়হাকী: (১/৪২৬)।] শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, “ফাসেকের আযান শুদ্ধ হবে কি না, এ ব্যাপারে দু’টি অভিমত রয়েছে, বিশুদ্ধ অভিমত অনুযায়ী আযান শুদ্ধ হবে না। কারণ, এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিপরীত, তবে ফাসেককে মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া কোনো মত অনুসারেই বৈধ নয়”। [ইখতিয়ারাতুল ফিকহিয়্যাহ, লি শায়খুল ইসলাম: (পৃ. ৫৭)।] যার অবস্থা গোপন তার আযান বৈধ। আল্লামা আব্দুল আযীয ইবন বায রহ.-কে বলতে শুনেছি: “ফাসেকের আযানের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, দাঁড়ি কর্তনকারী স্পষ্ট ফাসেক, তার অবস্থা গোপন নয়, আল্লাহর নিকট আমরা পানাহ চাই, দাঁড়ি কর্তনকারী ব্যতীত অন্য কাউকে মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করা জরুরি”। [রওজুল মুরবি গ্রন্থের ব্যাখ্যার সময় আমি তার মুখে এ বাণী শ্রবণ করি। ফজর সালাতের পর, শনিবার: (১০/১১/১৪১৮ হিজরী)।]
এখানে আদেল শব্দের অর্থ হচ্ছে: মুসলিম হওয়া, বিবেকী হওয়া, পুরুষ হওয়া, একজন হওয়া, নীতিবান ও বুঝমান হওয়া। [শারহুল মুমতি: (২/৬২)।]