পরিচ্ছেদঃ ৫
দ্বিতীয় ঘটনা :
হাফেজ ইবনে কাসির রহ. ইমাম জাউজির বরাত দিয়ে বলেন, আবদাহ বিন আব্দুর রহিম নামে এক মুজাহিদ ২৭৮ হিজরি সনে মারা যায়। যার সম্পর্কে শ্রুতি রয়েছে যে, সে অধিকাংশ সময় ইউরোপের বিরুদ্ধে জেহাদে ব্যস্ত থাকত। একবারের ঘটনা, মুজাহিদগণ ইউরোপের একটি দেশ ঘেরাও করে রেখে ছিল, দূর্গের ভেতর অবস্থানকারী এক নারীর প্রতি তার দৃষ্টি পড়ল, আর এতেই সে তার প্রেমে পড়ে যায়। আরম্ভ হল চিঠির আদান-প্রদান, সে তাকে লিখল আমি তোমাকে কীভাবে পেতে পারি ? সে বলল, তুমি খৃষ্টান হও আর দেয়াল টপকে আমার কাছে চলে এসো, সে তাতে সাড়া দিল। বিষয়টি মুসলমানদের খুব ভাবিয়ে তুলল, বরং, আতঙ্কিত করল। সকলেই মর্মাহত হল, অনেক আফসোস করল, কঠিন মনে হল তাদের কাছে তার ঘটনাটি। কয়েক বৎসর পর তার সাথে একদল মুজাহিদের সাক্ষাত। তারা দেখতে পেল, তখনও সে ঐ মহিলার সাথে সংসার করছে, তারা জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার ? কোথায় গেল তোমার কুরআন? আর তোমার আমল, রোজা, জেহাদ ও নামাজের খবর কি ? সে বলল, আমি পূর্ণ কুরআন ভুলে গেছি, শুধু একটি আয়াত আমার মনে আছে,
رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ . ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ ﴿الحجر :2-3﴾
‘যারা কুফরি করেছে তারা একসময় কামনা করবে, যদি তারা মুসলমান হত! তাদেরকে ছেড়ে দাও, আহারে ও ভোগে তারা মত্ত থাকুক এবং আশা তাদেরকে গাফেল করে রাখুক, আর অচিরেই তারা জানতে পারবে।' (সূরা হিজর : ২-৩) সে আরো জানাল, এখন তো আমার তাদের মধ্যে অনেক সন্তান ও সম্পদ হয়েছে।’ (আল বেদায়া : ১১ / ৬৪)
বিভিন্ন কারণে মানুষ অশ্লীলতা ও বেহায়াপনায় জড়িয়ে পড়ে, নিমজ্জিত হয় তাতে আপাদ মস্তক। যার প্রাথমিক কারণ হচ্ছে গান-বাদ্য। মূলত গান-বাদ্য হচ্ছে যেনা ও অশ্লিলতার মন্ত্র।
ইয়াজিদ ইবনে ওলিদ বলেন, ‘হে উমাইয়্যা সম্প্রদায়, গান-বাদ্য থেকে বিরত থাক। কারণ, গান-বাদ্য লজ্জা খতম করে দেয়, প্রবৃত্তির উত্তেজনা বৃদ্ধি করে ও ব্যক্তিত্ব নষ্ট করে। এগুলো নেশার মত, নেশার মতই এর কাজ, যদি কখনো তোমাদের এগুলো করতে হয়, তবে নারীদের দূরে রাখ। কারণ, গান যিনার প্রতি প্রলুব্দ করে।
ইবনে কাইয়ূম রহ. বলেন, একটি প্রবাদ রয়েছে : মেয়েদের যখন ছেলেরা ফাঁদে ফেলতে না পারে, তখন তাদের গান শোনায়, যার ফলে তাদের অন্তরে এক ধরণের দুর্বলতার সৃষ্টি হয়। কারণ, মেয়েরা আওয়াজ শোনে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হয়, আর সে আওয়াজ গানের হলে তাদের অন্তরে দু’ভাবে বিশেষ ক্রিয়ার সৃষ্টি করে : আওয়াজের দ্বারা, গানের অর্থের দ্বারা। এ জন্যই রাসূল সা. আনজাসা হাদিয়াকে বলেছেন, ‘হে আনজাসা, নারীদের সঙ্গে ধীরে চল নীতি গ্রহণ কর।’ (বুখারী, মুসলিম) এর সঙ্গে যদি ঢোল-তবলা, বাদ্যযন্ত্র ও সুন্দরী নারীদের নাচ-গান ইত্যাদি জমা হয়, তবে তো বলার অপেক্ষা রাখে না। নারীরা যদি কোন আওয়াজের মাধ্যমে গর্ভ ধারণ করতে সক্ষম হত, তবে সে আওয়াজ গানেরই হত।
আল্লাহর শপথ, কত শালীন নারী শুধু গানের কারণে ব্যভিচারীনি হয়েছে! কত ভদ্র ছেলে এ গানের কারণে শিশু-কিশোরীদের দাসে পরিণত হয়েছে! কত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি গানের কারণে রুচিহীন ও অপধার্থে পরিণত হয়েছে! কত নিষ্পাপ আদম সন্তান গানের কারণে নানা মুসিবতের শিকার হয়েছে! যার কোন ইয়ত্তা নেই।
সব চেয়ে ক্ষতিকর জিনিস হচ্ছে হারাম দৃষ্টি। বাজার, সিনেমা, টিভি, ইন্টারনেট, ডিশলাইন ও অশ্লীল ম্যাগাজিনে এ দৃষ্টির ফলেই অন্তরে অনেক ফেৎনার সূচনা হয়েছে, যা শেষ হয়েছে অফসোস, লাঞ্ছনা ও চরম অপমানের মাধ্যমে। ইমাম আহমদ রহ. বলেন, যেখানে দৃষ্টি পড়লে ফেৎনার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে দৃষ্টি না দেয়াই শ্রেয়, যেহেতু অনেক দৃষ্টিই ব্যক্তির অন্তরে ভূমিকম্পনের ঝড় তুলেছে।’ (জাম্মুল হাওয়া : ১১৬)
ইবনে জাওজি রহ. যথেচ্ছাচারী দৃষ্টি সম্পর্কে বলেন, ‘জেনে রেখ, চোখ অন্তরের বার্তাবাহক, সে বাইরে দেখা সকল জিনিসের সংবাদ দ্রুত অন্তরের কাছে পৌঁছে দেয়, তুলে ধরে তার ছবি, আর অন্তর তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়, পরকাল নিয়ে চিন্তা করার সময় তখন আর থাকে না। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি অবনত রাখার নিদের্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ ﴿النور :30﴾
‘মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের নিজ দৃষ্টিকে সংযত রাখে।’ (নূর : ৩০)
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنّ . َ﴿النور :31﴾
‘আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে।’ (নূর : ৩১)
এর পরেই আল্লাহ তাআলা দৃষ্টির সর্বশেষ নতিজা উল্লেখ করে বলেন,
وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ . ﴿30﴾
‘এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে।’ (নূর : ৩০)
وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ . ﴿النور :31﴾
‘এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।’ (নূর : ৩১ )
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. কু-দৃষ্টি ও তার পশ্চাতের পরিণতির আলোচনায় বলেন, কু-দৃষ্টি কখনো কখনো মানুষকে শিরকে লিপ্ত করে ঈমানহীন করে দেয়। তিনি বলেন, ‘কু-দৃষ্টি ও নারীসঙ্গের ফলে যে সগিরা গুনা হয়, কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার ফলে তা মাফ হয়ে যায়। তবে, বারবার কু-দৃষ্টি ও নারী সঙ্গে লিপ্ত থাকার ফলে সগিরা গুনাহগুলো কবিরা গুনাহে পরিণত হয়। বরং বারবার সংঘটিত সগিরা গুনাহ হটাৎ ঘটে যাওয়া কবিরা গুনাহ থেকেও ক্ষতিকর। কারণ, বারবার কু-দৃষ্টি ও নারী সঙ্গের ফলে অন্তরে পরস্পরের সম্পর্ক ও যৌন কামনার সৃষ্টি হয়, যা হটাৎ ঘটে যাওয়া যেনার চেয়েও মারাত্বক। আর এ জন্যই ফোকাহায়ে কেরাম সৎ সাক্ষ্য দাতাদের সম্পর্কে বলেছেন। তারাই সৎ সাক্ষ্য দাতা যাদের থেকে কবিরা গুনাহ সংঘটিত হয় না এবং যারা বারবার সগিরা গুনাহ করে না। কবিরা গুনাহ কখনো কখনো কুফরির কারণ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
(আরবি)
‘আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহকে ভালবাসার মত ভালবাসে।’ (বাকারা : ১৬৫)
মানুষের প্রেম-ভালবাসা মূলত আল্লাহর প্রতি মহববত ও তার ওপর ঈমানের দুর্বলতার প্রমাণ। এ ধরণের মহববত ও ভালবাসার কারণেই লূত আলাই হিস্সলামের কাফের গোষ্ঠীর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাজিল করেন।’ (মাজমুউল ফতওয়া : খ: ১৫, পৃ:২৯২-২৯)
ইবনুল কাইয়ূম রহ বলেন, ‘চোখ অন্তরের আয়না স্বরূপ, চোখ বন্ধ করলে অন্তরও তার প্রবৃত্তির ওপর পর্দা টেনে দেয়। আর চোখ উন্মুক্ত রাখলে অন্তরও তার প্রবৃত্তি উন্মুক্ত করে রাখে।’ তিনি আরো বলেন, অন্তরের মধ্যে কু-দৃষ্টির প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার পর, ব্যক্তি যদি দৃঢ় সঙ্কল্প গ্রহণ করে এবং সাথে সাথে তার মূল উপড়ে ফেলে, তবে এর প্রতিকার করা খুব সহজ। এর বিপরীতে যদি সে বারবার তাকাতে থাকে, তার ছবি অন্তরে বারবার স্মরণ করতে থাকে, তবে তার ভালবাসা অন্তরে প্রোথিত হয়ে যাবে। কারণ, বারবার দৃষ্টি দেয়ার অর্থ হচ্ছে কু-প্রবৃত্তির গাছটি পানি দ্বারা সিঞ্চন করা। আর এভাবেই প্রবৃত্তির গাছটি ক্রমশ বড় হয়ে একদিন তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, ভুলিয়ে দিবে তাকে নিজ দায়িত্ব। অধিকন্তু সে এর কারণে বিভিন্ন পরীক্ষা ও কষ্টের সম্মুখিন হবে, নানা অপকর্মে লিপ্ত হবে।’ (রওজাতুল মুহিববীন : পৃ : ৯২-৯৫)
অশান্তি ও অস্থিতিশীল পরিবেশের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দায়ী নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা। এটাই হচ্ছে সে পথ, যার দ্বারা মানুষ খুব সহজেই নির্লজ্জ, বেহায়া ও ব্যভিাচারে লিপ্ত হয়। জিন ও মানুষ প্রকৃতির শয়তানগুলো তাদের হাতিয়ার হিসেবে এ অবাধ মেলামেশাকেই সর্বত্র ও সবখানে ব্যাপক করে চলেছে।
ইবনুল কাইয়ূম রহ. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ক্ষতি সম্পর্কে বলেন, ‘নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা সকল মুসিবত ও সর্বনাশের মূল। সর্বগ্রাসী মহা বিপদের একটি অশনি সঙ্কেত। অধিকন্তু তা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে এবং অনেক হত্যা, অপমৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম দেয়। নবি মুসা আ.-এর সৈন্যদের মাঝে কিছু বেশ্যা নারীর অনুপ্রবেশ ঘটলে তাদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর মহামাড়ি নাজিল করেন এবং একই দিনে সত্তুর হাজার লোকের মৃত্যু ঘটান। এটা বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থের প্রসিদ্ধ ঘটনা। সুতরাং আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি যে, মৃত্যুহার বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হচ্ছে যেনার বিস্তার ও তার প্রসার, যা সাধারণত নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শন, নগ্ন ও অর্ধনগ্নাবস্থায় নারীদের চলাফেরার কারণে হয়ে থাকে।’ (আত্তুরুকুল হিকমিয়্যাহ : ২৫৯)
প্রেম-ভালবাসা মূলত ইমানের দুর্বলতার পরিচয়। কারণ, অন্তরে যখন ইমানের উপস্থিতি কম হয়, তখনই প্রবৃত্তি ও কু-কামনা বৃদ্ধি পায়, বরং তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।’ (আল-ফাওয়ায়েদ : লি-ইবনিল কাইয়ূম-পৃ : ৭৫)
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে যাদের ইখলাসপূর্ণ সম্পর্ক নেই, বরং তারা কোন না কোন শিরকে মগ্ন, তারাই সাধারণত কামভাব ও কু-প্রবৃত্তিতে লিপ্ত হয়। আল্লাহ তার বান্দা ইউসুফ আ. সম্পর্কে বলেন,
(আরবি)
‘এভাবেই, যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দেই। নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (ইউসুফ : ২৪)
লক্ষ্যণীয়, আজিজের স্ত্রী স্বধবা, তা সত্বেও সে কু-কর্মের প্রস্তাব দিয়েছে, পক্ষান্তরে ইউসুফ আ. অবিবাহিত, তা সত্বেও সে তার প্রস্তাব প্রত্যাক্ষান করেছে। এদিকে আজিজের স্ত্রীর ফুসলানো, অন্য নারীদের দ্বারা প্ররোচিত করা, প্রস্তাবে সাড়া না দিলে জেলখানায় নিক্ষেপের হুমকি তো রয়েছেই। এতো কিছুর পরও আল্লাহর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও ইখলাসের বদৌলতে আল্লাহ তাকে হেফাজত করেছেন। এভাবেই ইবলিসের বিপরীতে আল্লাহ তাআলা নিজ ওয়াদা পূরণ করে থাকেন। ইবলিস বলেছিল,
(আরবি)
‘সে বলল, আপনার ইজ্জতের কসম! আমি তাদের সকলকেই বিপদগামী করে ছাড়ব, তাদের মধ্য থেকে আপনার একনিষ্ঠ বান্দারা ছাড়া।’ (সাদ : ৮২-৮৩) তার বিপরীতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
(আরবি)
‘নিশ্চয় আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই, তবে পথভ্রষ্টরা ছাড়া, যারা তোমাকে অনুসরণ করছে।’ (হিজর : ৪২) বিপদগ্রস্ত ও পথভ্রষ্ট হওয়ার অর্থই হচ্ছে প্রবৃত্তির অনুসরণ করা।’ (মাজমূউল ফতওয়া : খ:১৫: পৃ:৪২১)