পরিচ্ছেদঃ ৪৯
পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ: জান্নাতের পথ ও জাহান্নামের পথ
প্রথমত: জান্নাতের পথ:
জান্নাতে যাওয়ার উপায় হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা। আল্লাহর বাণী:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱسۡتَجِيبُواْ لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمۡ لِمَا يُحۡيِيكُمۡۖ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ يَحُولُ بَيۡنَ ٱلۡمَرۡءِ وَقَلۡبِهِۦ وَأَنَّهُۥٓ إِلَيۡهِ تُحۡشَرُونَ ٢٤ ﴾ [ الانفال : ٢٤ ]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দাও; যখন সে তোমাদেরকে আহবান করে তার প্রতি, যা তোমাদেরকে জীবন দান করে। জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন। আর নিশ্চয় তাঁর নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।” [আল-আনফাল: ২৪]
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَا تَوَلَّوۡاْ عَنۡهُ وَأَنتُمۡ تَسۡمَعُونَ ٢٠ ﴾ [ الانفال : ٢٠ ]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, অথচ তোমরা শুনছ।” [আল-আনফাল: ২০]
﴿ وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ٧ ﴾ [ الحشر : ٧ ]
“রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।” [সূরা হাশর: ৭]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,
﴿ قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا عَلَيۡهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيۡكُم مَّا حُمِّلۡتُمۡۖ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهۡتَدُواْۚ ٥٤ ﴾ [ النور : ٥٤ ]
“বল, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।’ তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে সে শুধু তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী। আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর তবে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে।” [সূরা : আন্-নূর:৫৪]
﴿ لَّا تَجۡعَلُواْ دُعَآءَ ٱلرَّسُولِ بَيۡنَكُمۡ كَدُعَآءِ بَعۡضِكُم بَعۡضٗاۚ قَدۡ يَعۡلَمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنكُمۡ لِوَاذٗاۚ فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ ٦٣ ﴾ [ النور : ٦٣ ]
“তোমরা পরস্পরকে যেভাবে ডাকো রাসূলকে সেভাবে ডেকো না; তোমাদের মধ্যে যারা চুপিসারে সরে পড়ে আল্লাহ অবশ্যই তাদেরকে জানেন। অতএব যারা তাঁর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন তাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসা অথবা যন্ত্রণাদায়ক আযাব পৌঁছার ভয় করে।” [সূরা : আন্-নূর: ৬৩]
﴿ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِيمًا ٧١ ﴾ [ الاحزاب : ٧١ ]
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই এক মহা সাফল্য অর্জন করল।” [সূরা : আল্-আহযাব: ৭১]
﴿وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٣﴾ [ النساء : ١٣ ]
“আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা” [সূরা আন-নিসা: ১৩]
সুতরাং যে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে সেই সফলকাম হয়েছে। আল্লাহর বাণী:
﴿ قَدۡ أَفۡلَحَ مَن زَكَّىٰهَا ٩ ﴾ [ الشمس : ٩ ]
“নিঃসন্দেহে সে সফলকাম হয়েছে, যে তকে পরিশুদ্ধ করেছে”’। [সূরা আশ-শামস: ৯]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : «كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى»، قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَنْ يَأْبَى؟ قَالَ : «مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى»
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করে। তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করল।” [বুখারী, হাদীস নং ৭২৮০।]
وعنه قال : قال رسول الله : «مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهَ»
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যারা আমার অনুসরণ করে তারা মূলত আল্লাহরই অনুসরণ করল। আর যারা আমার অবাধ্য হলো তারা মূলত আল্লাহরই অবাধ্য হলো।” [বুখারী, হাদীস নং ২৯৫৭, মুসলিম, হাদীস নং ১৮৩৫।]
জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম উপায় হলো উপকারী ইলম বা জ্ঞান অর্জন করা। আর তা হলো কুরআন ও সুন্নহের ইলম অর্জন করে তদানুযায়ী আমল করা। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ »
“যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের পথে চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” [মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৯।]
বান্দাহ যখন জান্নাতীদের আমল করে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতে পৌঁছে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ وَلَلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ لَّكَ مِنَ ٱلۡأُولَىٰ ٤ ﴾ [ الضحا : ٤ ]
“আর অবশ্যই তোমার জন্য পরবর্তী সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম।” [সূরা আদ-দুহা: ৪]
জান্নাতে যাওয়ার উপায়সমূহ সংক্ষেপে নিম্নরূপ:
আল্লাহ, ফিরিশতা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, কিয়ামত ও তাকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান আনা। শাহাদাতাইন তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এর অনুযায়ী আমল করা। সালাত কায়েম করা, যাকাত দেয়া, রমাদান মাসের সাওম পালন করা, সামর্থবান হলে হাজ্জ আদায় করা।
এমনিভাবে আল্লাহর ইবাদাত করা যেন তুমি তাকে দেখছ, আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও তবে ভাবো তিনি তো তোমাকে দেখছেন। কথা ও কাজে সত্যবাদী হওয়া, আমানতের হেফাযত করা, ওয়াদ পূর্ণ করা, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, প্রতিবেশীর প্রতি দয়া করা, ইয়াতীম মিসকিন, দাসদাসী ও পশুপাখির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, মেহমানের সম্মান করা, একজন মুসলিম ভাইয়ের বিপদে সহযোগিতা করা, বিপদগ্রস্ত লোকের সাহায্য করা, একজন মুসলিমের দোষ গোপন করা, তাকে সাহায্য করা, একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদাত করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য মহব্বত রাখা, আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহর রহমতের আশা করা, আল্লাহর নিকট তাওবা করা, আল্লাহর আদেশের উপর ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর যিকির করা, তাঁর নিকট দু‘আ করা ও চাওয়া, সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা, কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, যে তোমাকে বঞ্চিত করে তাকে তুমি দেবে আর যে তোমার প্রতি অবিচার করে তুমি তাকে ক্ষমা করবে, কেননা আল্লাহ তা‘আলা মুত্তাকিনদের জন্য জান্নাত তৈরি করে রেখেছেন। আল্লাহ বলেছেন,
﴿ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي ٱلسَّرَّآءِ وَٱلضَّرَّآءِ وَٱلۡكَٰظِمِينَ ٱلۡغَيۡظَ وَٱلۡعَافِينَ عَنِ ٱلنَّاسِۗ وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٣٤ ﴾ [ ال عمران : ١٣٤ ]
“যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন।” [সূরা আলে ইমরান: ১৩৪]
যাবতীয় কর্মে ইনসাফ করা, আল্লাহর সব মাখলুকের প্রতি ইনসাফ করা; এমনকি কাফিরদের প্রতি ও, মানুষকে খানা খাওয়ানো, সালামের প্রসার করা, গভীর রাতে সালাত আদায় করা, সদাচরণ করা, আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল, কিতাব, মুসলিমদের ইমাম ও সাধারণ মুসলিমদের হিতাকাংখী হওয়া ইত্যাদি। এ সব আমল ও এ ধরনের যে সব আমল আছে যে গুলো দ্বারা একজন বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। আর এটিই হল, মহা সফলতা। [এসব আমলের অধিকাংশই উল্লেখ আছে মাজমুয়ায়ে ফতওয়ায়ে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ: ১০/৪২২-৪২৩।]
জান্নাতে যাওয়ার সব আমল এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে একথায় বলা যায় যে, জান্নাতীদের সব আমল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ ও আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেছেন,
﴿ ۚ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٣ ﴾ [ النساء : ١٣ ]
“আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা” [সূরা আন-নিসা: ১৩]