পরিচ্ছেদঃ ৩
হাদিসের প্রামাণিকতার পক্ষে কুরআনের দলিল:
১. কুরআনুল কারীমের কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা ওয়াজিব, তার বিরোধিতা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাসূলের আনুগত্য করা মূলত আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করা। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا ٥٩ ﴾ [ النساء : ٥٩ ]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর”। [সূরা নিসা: (৫৯)]
এখানে আল্লাহ তা‘আলা নিজের ও তার রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদানের জন্য ( وأطيعوا ) ক্রিয়াটি পুনরায় উল্লেখ করেছেন। এ দিকে ইঙ্গিত করার জন্য যে, রাসূলের আনুগত্য করা এককভাবে ফরয, তার নির্দেশকে কুরআনের সামনে রেখে যাচাই করার প্রয়োজন নেই, বরং সর্বাবস্থায় তার নির্দেশ মানা ওয়াজিব, কুরআনে থাক বা নাক। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ ۞يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَلَا تُبۡطِلُوٓاْ أَعۡمَٰلَكُمۡ ٣٣ ﴾ [ محمد : ٣٣ ]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না”। [সূরা মুহাম্মদ: (৩৩)]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظٗا ٨٠ ﴾ [ النساء : ٨٠ ]
“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করি নি”। [সূরা আন-নিসা: (৮০)] অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ٧ ﴾ [ الحشر : ٧ ]
“রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর”। [সূরা আল-হাশর: (৭)] এ থেকে প্রমাণিত হয় হাদিস দলিল ও ইসলামী শরীয়তের পরিপূর্ণ এক উৎস।
২. কতক আয়াতে ঈমানকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য, তার ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ ও তার আদেশ-নিষেধকে মেনে নেয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا ٣٦ ﴾ [ الاحزاب : ٣٦ ]
“আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে”। [সূরা আহযাব: (৩৬)]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [ النساء : ٦٥ ]
“অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়”। [সূরা আন-নিসা: (৬৫)]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ إِنَّمَا كَانَ قَوۡلَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذَا دُعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَهُمۡ أَن يَقُولُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَاۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٥١ ﴾ [ النور : ٥١ ]
“মুমিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এ মর্মে আহ্বান করা হয় যে, তিনি তাদের মধ্যে বিচার, মীমাংসা করবেন, তাদের কথা তো এই হয় যে, তখন তারা বলে: ‘আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। আর তারাই সফলকাম”। [সূরা আন-নুর: (৫১)] এসব আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালা মেনে নেয়া ও তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ঈমানের অংশ।
৩. কুরআনুল কারীমের কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস আল্লাহর পক্ষ থেকে একপ্রকার ওহী, তিনি নিজের পক্ষ থেকে শরীয়তের বিষয়ে কিছু বলেন নি। তাই তার হারাম করা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে হারাম করা। যেমন ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ وَلَوۡ تَقَوَّلَ عَلَيۡنَا بَعۡضَ ٱلۡأَقَاوِيلِ ٤٤ لَأَخَذۡنَا مِنۡهُ بِٱلۡيَمِينِ ٤٥ ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡهُ ٱلۡوَتِينَ ٤٦ فَمَا مِنكُم مِّنۡ أَحَدٍ عَنۡهُ حَٰجِزِينَ ٤٧ ﴾ [ الحاقة : ٤٤، ٤٧ ]
“যদি সে আমার নামে কোন মিথ্যা রচনা করত, তবে আমি তার ডান হাত পাকড়াও করতাম। তারপর অবশ্যই আমি তার হৃদপিণ্ডের শিরা কেটে ফেলতাম। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউই তাকে রক্ষা করার থাকত না”। [সূরা আল-হাক্কাহ: (৪৪-৪৭)]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿قَٰتِلُواْ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ ٱلۡحَقِّ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ حَتَّىٰ يُعۡطُواْ ٱلۡجِزۡيَةَ عَن يَدٖ وَهُمۡ صَٰغِرُونَ ٢٩﴾
“তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সেসব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযইয়া দেয়”। [সূরা আত-তাওবাহ: (২৯)]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِيَّ ٱلۡأُمِّيَّ ٱلَّذِي يَجِدُونَهُۥ مَكۡتُوبًا عِندَهُمۡ فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَٱلۡإِنجِيلِ يَأۡمُرُهُم بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَىٰهُمۡ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡخَبَٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنۡهُمۡ إِصۡرَهُمۡ وَٱلۡأَغۡلَٰلَ ٱلَّتِي كَانَتۡ عَلَيۡهِمۡۚ ١٥٧ ﴾ [ الاعراف : ١٥٦ ]
“যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃঙ্খল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে”। [সূরা আল-আরাফ: (১৫৭)] এসব আয়াত প্রমাণ করে যে, হাদিস আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী, তাই কুরআনের ন্যায় হাদিসও দলিল।
৪. কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের ব্যাখ্যা দানকারী এবং তিনি উম্মতকে হিকমত শিক্ষা দেন, যেমন তিনি শিক্ষা দেন কুরআন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:
﴿بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَٱلزُّبُرِۗ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّكۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡهِمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ ٤٤ ﴾ [ النحل : ٤٤ ]
“এবং তোমার প্রতি নাযিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাযিল হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে”। [সূরা আন-নাহাল: (৪৪)]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ وَمَآ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ ٱلَّذِي ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ لِّقَوۡمٖ يُؤۡمِنُونَ ٦٤ ﴾ [ النحل : ٦٤ ]
“আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি, শুধু এ জন্য যে, যে বিষয়ে তারা বিতর্ক করছে, তা তাদের জন্য তুমি স্পষ্ট করে দেবে এবং (এটি) হিদায়াত ও রহমত সেই কওমের জন্য যারা ঈমান আনে”। [সূরা আন-নাহাল: (৬৪)]
﴿ وَأَنزَلَ ٱللَّهُ عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ ١١٣ ﴾ [ النساء : ١١٣ ]
“আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমত”। [সূরা নিসা: (১১৩)]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ وَٱلۡحِكۡمَةِۚ ٣٤ ﴾ [ الاحزاب : ٣٤ ]
“আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত পঠিত হয়- তা তোমরা স্মরণ রেখো। [সূরা আহযাব: (৩৪)]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ لَقَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ١٦٤ ﴾ [ ال عمران : ١٦٤ ]
“অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল”। [সূরা আলে-ইমরান: (১৬৪)]
আলেমগণ বলেছেন: এখানে হিকমত দ্বারা উদ্দেশ্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস। ইমাম শাফে‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তা‘আলা উক্ত আয়াতে কিতাব উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ কুরআন। আমি কুরআনের এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, যার প্রতি আমি সন্তুষ্ট, তিনি বলেছেন: হিকমত অর্থ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস। এখানে কুরআন উল্লেখ করে তার পশ্চাতে হিকমত উল্লেখ করা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব এখানে হিকমত অর্থ হাদিস ভিন্ন অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন ও হাদিস এ দু’টি বস্তুই শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ ভালো জানেন। দ্বিতীয়ত এখানে যেরূপ কুরআনের পাশাপাশি হিকমত রয়েছে, সেরূপ আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি রাসূলের আনুগত্য মানুষের উপর ফরয করা হয়েছে। অতএব আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদিস ব্যতীত অন্য কিছু ফরয বলা বৈধ নয় …”। [আর-রেসালা: (৭৮)]
৫. কুরআনে যেসব ইবাদত ও আহকাম অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, হাদিস তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের উপর সালাত ফরয করেছেন, কিন্তু তিনি তার সময়, রোকন ও রাকাত সংখ্যা বর্ণনা করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সালাত ও প্রশিক্ষণ দ্বারা মুসলিমদের তার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি বলেছেন:
«صلوا كما رأيتموني أصلي» رواه البخاري .
“তোমরা সালাত আদায় কর, যেমন আমাকে সালাত আদায় করতে দেখ”। [বুখারি: (৫৫৭৬)]
আল্লাহ তা‘আলা হজ ফরয করেছেন, কিন্তু তার মাসায়েল বর্ণনা করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাসায়েল বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন:
«لِتَأْخُذُوا مَنَاسِكَكُمْ» رواه مسلم .
“তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজের মাসায়েল শিখে নাও”। [মুসলিম (১২৯৭)]
আল্লাহ তা‘আলা যাকাত ফরয করেছেন, কিন্তু কোন্ সম্পদ, কি পরিমাণ ফসল ও কোন্ জাতীয় ব্যবসায়ী পণ্যে যাকাত ফরয হবে, তার বর্ণনা দেন নি, অনুরূপ তার প্রত্যেকটির নিসাবও বর্ণনা করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসের মাধ্যমে তার পরিপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন। অতএব হাদিস ব্যতীত কুরআন বুঝা অসম্ভব।
৬. কুরআনে বর্ণিত অনেক সাধারণ নীতিকে হাদিস খাস করেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يُوصِيكُمُ ٱللَّهُ فِيٓ أَوۡلَٰدِكُمۡۖ لِلذَّكَرِ مِثۡلُ حَظِّ ٱلۡأُنثَيَيۡنِۚ ١١ ﴾ [ النساء : ١١ ]
“আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ”। [সূরা নিসা: (১১)]
উত্তরাধিকার বা মিরাসের ক্ষেত্রে এখানে কুরআন একটি সাধারণ নীতির বর্ণনা দিয়েছে, যা প্রত্যেক মাতা-পিতা ও তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কিন্তু হাদিস খাস করে দিয়েছে যে, পিতা নবী হলে তার সম্পদের মধ্যে মিরাস প্রতিষ্ঠিত হবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«نحن معاشر الأنبياء لا نورث ما تركناه صدقة» رواه مسلم .
“আমরা নবীদের জামাত, আমাদের কেউ উত্তরাধিকার হয় না, আমাদের রেখে যাওয়া সম্পদ সদকা”। [মুসলিম।]
আর উত্তরাধিকারী থেকে হত্যাকারীকে বাদ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لا يرث القاتل»، رواه الترمذي وأحمد وغيرهما، وصححه الألباني .
“হত্যাকারী উত্তরাধিকার হবে না”। [তিরমিযি ও ইমাম আহমদ প্রমুখগণ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, ইমাম আলবানি তা সহিহ বলেছেন।] অতএব কুরআনের সাধারণ নীতি শামিল করলেও হাদিসের কারণে নবীদের সম্পদে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং সন্তান হত্যাকারী হলে পিতার সম্পদের মিরাস পাবে না।
৭. কুরআনে বর্ণিত অনেক অনির্দিষ্ট বিধানকে হাদিস নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ وَٱلسَّارِقُ وَٱلسَّارِقَةُ فَٱقۡطَعُوٓاْ أَيۡدِيَهُمَا ٣٨ ﴾ [ المائدة : ٣٨ ]
“আর পুরুষ চোর ও নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও”। [সূরা আল-মায়েদা: (৩৮)]
এখানে হাত কাটার স্থান নির্দিষ্ট করা হয়নি, হাতের কব্জি, বাহু ও ভুজ সবার উপর( يد ) শব্দের প্রয়োগ হয়। কিন্তু হাদিস তা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, কব্জি থেকে হাত কাঁটা হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল তাই ছিল:
«أتي بسارق فقطع يده من مفصل الكف» . رواه الدار قطني .
“জনৈক চোরকে উপস্থিত করা হলে তার হাত কব্জি থেকে কর্তন করা হয়”। [দারা কুতনি; সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, নং ১৭২৪৮।]
৮. কুরআনে বর্ণিত বিধানকে হাদিস কখনো শক্তিশালী করেছে, কখনো তার ব্যাখ্যা দিয়েছে। যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম ও হজ, এসব ইবাদতের বর্ণনা যদিও কুরআনে রয়েছে, তথাপি হাদিস তার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।