পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামীনের প্রশংসা করছি যার নেআমতের মাধ্যমে সকল প্রকার ভাল আমল পূর্ণ হয়। অত:পর জামাআতে নামায আদায় করা সম্পর্কে উল্লেখিত মর্যাদা, ফযীলত ও উপকারিতা ইত্যাদি যার ফযীলত সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই অধিক অবগত আছেন, এগুলো বর্ণনা করার পর কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিকোন থেকে আমাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, ইসলামে জামাআতে নামাযের গুরুত্ব অপরিসীম ও ইহার মর্যাদাও সুমহান।
সম্মানীত পাঠকবৃন্দ! আপনাদের খেদমতে নিম্নে সাহাবা ও মুসলিম ওলামাদের কিছু উক্তি উপস্থাপন করছি, যা আমাদেরকে জামাআতে নামায আদায়ের হুকুম সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা দিবে।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ ও আবূ মূসা আল আশয়ারী (রা:) হতে বর্ণিত, তারা উভয়েই বলেন, যে আযান শুনে বিনা ওযরে নামাযের জন্যে মাসজিদে আসবে না তার নামায হবে না।
আলী (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আযান শুনার পর বিনা ওযরে মাসজিদে আসবে না তার নামায মাথার উপর উঠবে না।
আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আযান শুনে তার জবাব দিবে না অর্থাৎ নামাযের উদ্দেশ্যে মাসজিদে আসবে না সে নিজে তো কল্যাণ চাইল না, তার জন্যে কল্যাণ প্রত্যাশাও করা যায় না।
আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, শাস্তি স্বরূপ আদম সন্তানের দু কান শিসা দ্বারা পূর্ণ করা উত্তম, যে নামাযের জন্যে আহবানকারীর আহবান শ্রবণ করা সত্বেও মাসজিদে আসে না।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, তাঁকে সে ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল যে দিনে রোযা রাখে এবং রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়ে কিন্তু জামাআত ও জুমার নামাযে উপস্থিত হয় না। তিনি বললেন, সে জাহান্নামী।
আতা (রহ:) বলেন, গ্রামে হোক বা শহরে হোক আল্লাহর সৃষ্টি জীববের মধ্যে কারো জন্য আযান শ্রবন করার পর নামায ছেড়ে দেয়ার কোন সুযোগ নাই।
আওযায়ী (রহ:) বলেন, নামাযের জন্যে আযান শ্রবণ করুক বা না করুক জামাআত ও জুমা ছেড়ে দিয়ে পিতা-মাতার খেদমত করা বৈধ নয়। [- ‘‘আল-আওসাত ফিস সুনান ওয়াল ইজমা ওয়াল খেলাফ’’ ইবনু মুনযির ৪র্থ খন্ড ১৩৬, ১৩৭।]
ইমাম বুখারী (রহ:) তাঁর সহীহ বুখারীতে জামাআতে নামায পড়া ফরজ হওয়া সম্পর্কে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছেন।
হানাফী ও মালেকী মাযহাবের মতে, জামাআতে নামায পড়া হল সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। কিন্তু তাদের মতে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ছেড়ে দিলে গুনাহগার হয় এবং ইহা ছাড়া নামায বিশুদ্ধ হবে। উপরোক্ত মত এবং যারা বলেন জামাআতে নামায আদায় করা ফরজ তাদের মধ্যে মতবিরোধ হল শুধু শব্দগত। কিন্তু উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য একই। আবার কেউ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, তা ফরজ। অর্থাৎ জামাআতের সাথেই আদায় করা ফরজ। [-কিতাবুস্ সালাত: ইবনু কাইয়্যেম, ১১১পৃ:।]
হানাফী মাযহাব অনুসারী বিশিষ্ট আলেম আলাউদ্দিন আস-সামারকান্দি বলেছেন, জামাআতের সাথে নামায আদায় করা হল ফরজ। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ইহাকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলেছেন, কিন্তু আসল কথা একই। অর্থাৎ তা জামাআতের সাথে পড়া ফরজ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি জামাআতের সাথে নামায আদায় করা সকল সময় হেফাযত করেছেন। এমনিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সকলেই উহা ফরজ হিসেবে জেনে আসছে। যারা তা ছেড়ে দিয়েছে তাদেরকে তারা খারাপ ভেবে আসছে। [- তুহফাতুল ফুকাহা ১ম খন্ড: ৩৫৮পৃ:।]
ইমাম শাফেয়ী (রহ:) বলেছেন, যারা মাসজিদে এসে জামাআতের সাথে নামায আদায় করতে সক্ষম, অথচ বিনা কারণে আসে না তাদের না আসার ব্যাপারে শরীয়তে কোন অনুমতি আছে বলে আমি মনে করি না। [- কিতাবুল উম্ম, ইমাম শাফেয়ী (রহ:) পৃঃ ২৭৭।]
ইমাম নববী (রহ:) বলেছেন, জামাআতের সাথে নামায আদায় করা বিশুদ্ধ ও মাশহুর হাদীস ও মুসলিম উম্মাহর ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। এ ব্যাপারে আমাদের আলেমদের পক্ষ থেকে তিনটি অভিমত পাওয়া যায়। (১) কেউ বলেছেন, তা ফরযে কেফায়া (২) কেউ বলেছেন, ইহা সুন্নত। (৩) আবার কেউ কেউ বলেছেন, ইহা সকলের জন্যে ফরজ, কিন্তু নামায বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে শর্ত নয়। ইমাম নববী (রহ:) বলেন, তৃতীয় মতটি আমাদের মাযহাবের হাদীস ও ফিকহ্ বিষয়ক সুযোগ্য দুই বিজ্ঞ আলেম ব্যক্ত করেছেন, তারা হলেন, আবু বকর বিন খুযায়মা ও ইবনুল মুনযির (রহ:)। তবে রাফেয়ী উল্লেখ করেছেন, উক্ত মতটি ইমাম শাফেয়ী (রহ:) এর।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ:) এর মতে জামাআতে নামায পড়া সকলের উপর ফরজ। এর পরিত্যাগকারী গুনাহগার হবে। কিন্তু নামায বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে জামাআতে নামায আদায় করা শর্ত নয়। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল এর অন্য বর্ণনায় এসেছে, নামায বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে জামাআতের সাথে নামায আদায় করা শর্ত।
মারদাবী তাঁর ইনসাফ গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ করেছেন, বিনা শর্তে পুরুষের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাআতের সাথে আদায় করা ফরজ। আর এটাই সঠিক মাযহাব, এতে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। এ মতই অধিকাংশ আলেম-ওলামাদের এবং তাঁরা এ বিষয়ে দলীল-প্রমাণ উল্লেখ করেছেন। [-ইনসাফ, ইকনা ও মুগনী, অধ্যায়: জামাআতে নামায।]
আল্লামা শাইখুল ইসলাম ইব্নু তাইমিয়া (রহ:) বলেছেন, জামাআতের সাথে নামায আদায় করা সমস্ত মুসলমানদের মতে দ্বীনের অতী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের একটি বিষয়। ইহা সকল শ্রেণীর মুসলমানের উপর ফরজ। এ মত প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ সালাফে সালেহীন এবং হাদীসের ইমামগণ যেমন, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইসহাক এবং শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী কিছু সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ প্রমূখ। শাফেয়ী মতালম্বী কিছু লোক ও অন্যদের কাছে ইহা ফরজে কেফায়া। এ মতই শাফেয়ী মতালম্বীদের কাছে প্রাধান্যপ্রাপ্ত।
সর্বদা জামাআতে নামায পরিত্যাগকারী অত্যন্ত খারাপ লোক, তাকে খারাপই ভাবতে হবে। এ বিষয় তাকে শাস্তির ভয় দেখাতে হবে বরং শাস্তি প্রদান করতে হবে এবং তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। যদিও বলা হয় জামাআতে নামায আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
আল্লামা শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহ:) বলেছেন, যে এ বিশ্বাস করবে যে, মাসজিদে এসে মুসলমানের সাথে জামাআতের সাথে নামায আদায় করার চেয়ে বাড়ীতে নামায় আদায় করা উত্তম, সে মুসলমানদের ঐক্যমতে পথভ্রষ্ট ও বিদআতী। জামাআতের সাথে নামায আদায় করা সকলের উপর ফরজ অথবা ফরজে কেফায়া। কুরআন ও সুন্নাহর দলীলের ভিত্তিতে ইহা সকল শ্রেণীর মানুষের উপর ফরজ।
যারা জামাআতে নামায আদায় করা ফরজ না বলে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলেছেন তারাও ইহাকে একে বারে ছেড়ে দেয়াকে দোষের কারণ মনে করেছেন। এমনকি যারা জামাআতে নামায ব্যতীত ছোট ছো্ট সুন্নতকেও সর্বদা ছেড়ে দেয় তাদের মতে এ প্রকার লোকদের ন্যায়পরায়ণতার বিলুপ্তি ঘটে এবং (ইসলামী আদালতে) তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে না। তাই যদি হয় ছোট ছোট সুন্নত ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে তবে যারা জামাআতের সাথে নামায আদায় করা ফরজকে ছেড়ে দেয় তাদের কী অবস্থা? মুসলমানদের ঐক্যমতে তাদেরকে নামাযের জন্যে আদেশ দিতে হবে এবং তাদেরকে নিন্দা করতে হবে। তারা কোন বিষয় ফায়সালা করতে পারবে না, তাদের পক্ষ থেকে কোন প্রকার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না এবং তারা ফাতাওয়াও দিতে পারবে না যদি নিয়মিতভাবে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পরিত্যাগ করে। সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ছেড়ে দিলে যদি তার এ হুকুম হয় তবে যেটা ইসলামের অন্যতম প্রতিক তথা জামাআতের সাথে নামায পরিত্যাগ করলে তার কী বিধান হতে পারে? [- মাজমু’ ফাতাওয়াঃ ২৩তম খন্ড ২৫৩পৃঃ।]
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম (রহ:) বলেন, যে ব্যক্তি হাদীসের দলীল সঠিক ভাবে গবেষণা করবে তার কাছে এটাই সুস্পষ্ট হবে যে, মাসজিদে এসে নামায আদায় করা সকলের উপর ফরজ। কিন্তু কারণ পাওয়া গেলে জুমআ ও জামাআত ছাড়া যেতে পারে। বিনা কারণে মাসজিদে আসা ছেড়ে দেয়া মূল জামাআত ছেড়ে দেয়ারই নামান্তর। আর এ বিষয়ই হাদীসসমূহ ও সালাফে সালেহীনদের উক্তি সমর্থন করে।
আল্লামা ইব্নু তাইমিয়া (রহঃ) আরও বলেন,
আমরা যারা আল্লাহর দ্বীনকে মানি তারা এটাই মনে করি যে, বিনা কারণে মাসজিদের জামাআতে শরীক না হয়ে পিছে থাকা কোন ব্যক্তির জন্যে বৈধ নয়। আল্লাহ এ বিষয়ে অধিক ভাল জানেন। [- কিতাবুস সালাহ, ইবনুল কাইয়্যেম:১৩৭পৃ:।]
সৌদী আরবের বিজ্ঞ ওলামা পরিষদ ও দারুল ইফতা বোর্ড থেকে এ ফতোয়া এসেছে যে, প্রাপ্ত বয়স্ক সকল পুরুষের জন্যে মাসজিদে এসে জামাআতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আাদায় করা ফরজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সকল ফরজ নামাযসমূহ যারা বিনা কারণে মাসজিদে এসে জামাআতের সাথে আদায় করবে না তারা গুনাহগার। দলীল হল, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يَأْتِهِ فَلَا صَلَاةَ لَهُ إِلَّا مِنْ عُذْرٍ
ওওযে ব্যক্তি আযান শুনে বিনা কারণে মাসজিদে আসবে না তার নামায হবে না। [-দারাকুতনী ও ইবনু মাজাহ,অধ্যায়: জামাআতে নামায থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে সতর্কতা।]
ইবনু আব্বাস (রা:) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে যে, হাদীসে উল্লেখিত ওকারণহ বলতে কী বুঝায়? তিনি বলেছেন, তা হল ভয় অথবা অসুস্থতা। [- ফতোয়া বোর্ডঃ সৌদি আরব। ৭ম খন্ড: ২৯২পৃ:।]
উপরোল্লেখিত কুরআন, হাদীস, সাহাবা, সালাফে সালেহীন ও ওলামাদের উক্তি সমূহ আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট ভাবে এটাই প্রমাণিত হল যে, মাসজিদে এসে জামাআতবদ্ধ হয়ে নামায আদায় করা সকল মানুষের উপর ফরজ। তবে তা নামায বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে শর্ত নয়। যে কারণ ছাড়া তা থেকে দূরে থাকবে সে গুনাহগার এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য।
এমনিভাবে ওলামাদের আলোচনা দ্বারা আরও প্রতিয়মান হয় যে, যদিও তাদের মধ্যে জামাআতের সাথে নামায আদায়ে নামকরণের ব্যাপারে বাক্যের ভিন্নতা দেখা দিয়েছে, কেউ বলেছেন তা ফরজ, কেউ বলেছেন তা ফরজে কেফায়া, আবার কেউ বলেছেন তা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। কিন্তু সকলেই এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, যারা জামাআতে নামায পড়া ছেড়ে দিবে তারা গুনাহগার। আর ওলামাগণ বিশেষঃ মতবিরোধ করেছেন কেবল বাহ্যিক অর্থে। সুতরাং কেউ যেন তাদের এ মতানৈক্যকে সুযোগ মনে করে দলীল হিসেবে ব্যবহার করে এ মহান ইবাদত থেকে পিছে না থাকে।
আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদেরকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী, যাকাত আদায়কারী ও রুকুকারীদের অন্তর্ভূক্ত করেন। সেই সাথে আমাদের, আমাদের পিতা-মাতা, আমাদের ওস্তাদ ও সকল মুসলমানদের ক্ষমা করেন।