পরিচ্ছেদঃ ৫
নারীর ইসলামী শিক্ষা প্রসারে নিচের কয়েকটি ধাপে এগিয়ে যেতে পারি:
এক. নারীদেরকে জুম‘আর সালাতের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মহিলারা মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও তারা মসজিদে গিয়ে সালাত পড়তেন, বিশেষ করে জুম‘আর সালাত। কিন্তু পরবর্তী যুগে ফেতনা ফাসাদ বেড়ে যাওয়ায় যুগের চাহিদানুসারে উলামায়ে কেরাম মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন; কেউ কেউ এটাকে হারাম বলেছেন, কেউ এটাকে জায়েয বলেছেন, আবার কেউ মসজিদে না যাওয়াটাকে উত্তম বলেছেন। তাই আমি নিচে উলামা কিরামের মতামত প্রথমে উল্লেখ করব এবং তারা কী কী কারণে নিষেধ করেছেন? বর্তমানে মহিলাদেরকে মসজিদমুখী করা কতটুকু প্রয়োজন এবং এর হুকুম কী? কী কী শর্তসাপেক্ষে মহিলারা মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করতে পারবেন? বিশেষ করে জুমু‘আর সালাত।
যারা হারাম বলেছেন তাদের দলীল:
সহীহ বুখারী ও আবূ দাউদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«لَوْ أَدْرَكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ»
“যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বর্তমান) নারীদের অবস্থা দেখতেন, তবে তিনি তাদেরকে মসজিদে গিয়ে সালাত পড়তে নিষেধ করতেন, যেমনিভাবে বনী ইসরাঈলদের নারীদেরকে মসজিদে যেতে বারণ করা হয়েছিল”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮৬৯; আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৫৬৯।]
আবূ দাঊদে আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«صَلَاةُ الْمَرْأَةِ فِي بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي حُجْرَتِهَا، وَصَلَاتُهَا فِي مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي بَيْتِهَا»
“মহিলাদের ঘরে সালাত আদায় করা বৈঠকখানায় সালাত আদায় করার চেয়ে উত্তম এবং মহিলাদের সাধারণ থাকার ঘরে সালাত আদায় করার চেয়ে গোপন প্রকোষ্ঠে সালাত আদায় করা অধিক উত্তম”। [আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৫৭০।]
যারা জায়েয বলেছেন তাদের দলীল:
ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«كَانَتِ امْرَأَةٌ لِعُمَرَ تَشْهَدُ صَلاَةَ الصُّبْحِ وَالعِشَاءِ فِي الجَمَاعَةِ فِي المَسْجِدِ، فَقِيلَ لَهَا : لِمَ تَخْرُجِينَ وَقَدْ تَعْلَمِينَ أَنَّ عُمَرَ يَكْرَهُ ذَلِكَ وَيَغَارُ؟ قَالَتْ : وَمَا يَمْنَعُهُ أَنْ يَنْهَانِي؟ قَالَ : يَمْنَعُهُ قَوْلُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «لاَ تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ»
“উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর স্ত্রী (আতিকাহ বিনতে যায়িদ) ফজর ও ইশার সালাতের জামা‘আতে মসজিদে যেতেন। তাকে বলা হল, আপনি কেন (সালাতের জন্য মসজিদে) বের হন? অথচ আপনি জানেন যে, উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এটা অপছন্দ করেন এবং মর্যাদাহানিকর মনে করেন। তিনি জবাব দিলেন, তাহলে এমন কি বাধা রয়েছে যে, উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আমাকে স্বয়ং নিষেধ করছেন না? তিনি বললেন, তাকে বাধা দেয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “আল্লাহর দাসীদের আল্লাহর মসজিদে যেতে নিষেধ করো না”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯০০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪২।]
আবূ দাঊদে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ، وَلَكِنْ لِيَخْرُجْنَ وَهُنَّ تَفِلَاتٌ»
“তোমরা আল্লাহর দাসীদের আল্লাহর মসজিদে যেতে নিষেধ করো না, তারা যেন সুগন্ধি ছাড়া বের হয়”। [আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৫৬৫।]
কী কী কারণে না জায়েয বলেছেন ও তার প্রতিকার:
প্রথমত: নারীদের মসজিদে যাওয়া ফেতনা ফাসাদের কারণ হতে পারে। তবে পূর্ণ পর্দাসহ আলাদা স্থানে সালাত পড়লে এটার সম্ভাবনা থাকে না।
দ্বিতীয়ত: নারীরা সাজ-সজ্জায় অভ্যস্ত। যা পুরুষদেরকে আকৃষ্ট করতে পারে। এ সমস্যার সমাধানকল্পে স্বয়ং উপরোক্ত হাদীসেই এসেছে যে, “তারা যদি মসজিদে যায় তবে যেন সুগন্ধি ব্যবহার না করে”। এখানে সুগন্ধি দ্বারা সব ধরনের সাজ-সজ্জাকে মসজিদে যাওয়ার সময় নিষেধ করা হয়েছে।
মোদ্দাকথা, এখানে আমি মহিলাদেরকে মসজিদে জামা‘আতে সালাত আদায় করাকে উত্তম বা অনুত্তম বলছি না। কেননা এটা জায়েয বিষয়, হারাম বলাটা ঠিক হবে না। তবে আমার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের যদি জুমু‘আর সালাত ও অন্যান্য বিশেষ প্রয়োজনে মসজিদে আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা থাকত, তবে ইসলামী শিক্ষা থেকে তারা এতটা দূরে থাকত না। তাদের ইসলামী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টা লক্ষ্য রেখে তাদেরকে মসজিদমুখী করা দরকার।
কী কী শর্তসাপেক্ষে মহিলারা মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করতে পারবেন?
১. মসজিদে মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা সালাতের জায়গা থাকতে হবে ও আলাদা দরজা থাকতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَوْ تَرَكْنَا هَذَا الْبَابَ لِلنِّسَاءِ» قَالَ نَافِعٌ : فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ ابْنُ عُمَرَ حَتَّى مَاتَ
“যদি এই দরজাটি কেবলমাত্র মহিলাদের প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট করা হত (তবে উত্তমই হত)। নাফে‘ রহ. বলেন, অতঃপর ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা উক্ত দরজা দিয়ে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কোনোদিন প্রবেশ করেন নি।” [আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৪৬২, ৫৭১।]
অন্য বর্ণনায় ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার পরিবর্তে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কথা বলা হয়েছে।
২. মহিলারা পূর্ণ পর্দাসহ মসজিদে আসতে হবে ও উচ্চস্বরে কথা বলা যাবে না। সুগন্ধি থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ، وَلَكِنْ لِيَخْرُجْنَ وَهُنَّ تَفِلَاتٌ»
“তোমরা আল্লাহর দাসীদের আল্লাহর মসজিদে যেতে নিষেধ করো না, তারা যেন সুগন্ধি ছাড়া বের হয়”। [আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৫৬৫।]
৩. মহিলারা অভিভাবক বা স্বামীর অনুমতিক্রমে আসবে, তারা কোনো যৌক্তিক কারণে নিষেধ করলে আসা যাবে না ও একা একা না আসাই উত্তম।
৪. রাতের বেলায় মসজিদে না আসাই শ্রেয়, তবে ফেতনার ভয় না থাকলে কোনো অসুবিধা নেই।