পরিচ্ছেদঃ ৪
ইসলামী শরীয়াহ্ এর দলীল ও উৎসসমূহ :
ইসলামী শরীয়াহ্ এর প্রধান উৎস ও দলীল চারটি। সেগুলো হলঃ
আল-কুরআন : ইসলামী শরীয়াহ্ এর সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে আল-কুরআনুল কারীম। এ ব্যাপারে সকল সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমায়ীন), সকল যুগের ইমামগণ, মুফাসসিরীন, মুহাদ্দিসীন, ফুকাহা ও সকল উলামায়ে কিরামের ঐকমত্য ও ইজমা রয়েছে। ইসলামী শরীয়াহ্ এর সকল বিধানই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পবিত্র কুরআন কারীম থেকে উৎসারিত। ইতোপূর্বে উল্লেখিত দু’টো আয়াতে [সূরা আল-জাসিয়া : ১৮ ও সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৮] বলা হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নিজেই শরীয়াহ্ প্রণয়নকারী।
আস-সুন্নাহ্ : রাসূলুল্লাহ সা. এর কথা, কাজ, সম্মতি ও অনুমোদনকে বলা হয় আস্-সুন্নাহ। আস্-সুন্নাহ্ মূলত কুরআনেরই ব্যাখ্যা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّكۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡهِمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ ٤٤ ﴾ [ النحل : ٤٤ ]
‘‘আর আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেবার জন্য যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা করে।’’ [সূরা আন-নাহল : ৪৪]
তিনি আরো বলেন,
﴿ وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤ ﴾ [ النجم : ٣، ٤ ]
‘‘সে মনগড়া কথা বলে না। এতো অহী যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।’’ [সূরা আন-নাজম : ৩-৪]
আল-কুরআন ও সুন্নাহ দু’টোই যে অহী, এ ব্যাপারে আলেমগণের ঐকমত্য রয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, হাদীস শাস্ত্রের উসূল অনুযায়ী সুন্নাহ্-এর যে সকল হাদীস Authentic ও সহীহ শুধু সেগুলোই ইসলামী শরীয়ায় দলীল হিসেবে গৃহীত।
আল-ইজমা’ : ইজমা’ হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর মুসলিম উম্মাহর মুজতাহিদগণ কোনো এক যুগে শরীয়াহ্ এর কোন এক বিধানের উপর একমত হওয়া। [আল-মুস্তাসফা, ইমাম গাযালী, ১/১৭৩, শারহি আল-কাওকাব আল-মনীর, ইবনুন নাজ্জার, ২/২১১] ইজমা’র জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কুরআনের বিপরীত কোনো কিছুর উপর একমত না হওয়া। এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إن الله لا يجمع أمتي على ضلالة
‘‘আমার উম্মাতকে আল্লাহ ভ্রষ্টতার উপর কখনো একমত করবেন না।’’ [সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস নং ২০৯৩, এছাড়াও এ হাদীস বর্ণনা করেছে ইমাম আহমাদ ও হাকেম।] ইজমা’র বিধানের গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿ وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا ١١٥ ﴾ [ النساء : ١١٥ ]
‘‘কারো নিকট হেদায়াত প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব।’’ [সূরা আন-নিসা : ১১৫]
আল-কিয়াস : কিয়াস হচ্ছে কোনো বিষয়ের জন্য সে বিধান নির্ধারণ করা, যে বিধান স্পষ্টভাবে অন্য একটি বিষয়ের জন্য কুরআন বা হাদীসে বর্ণনা করা আছে, উভয় বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানকারী ‘ইল্লাত’ বা হেতু থাকার কারণে। [আল-বুরহান, ইমামুল হারামাইন, ২/৩৮৭, আল-মুস্তাসফা, ইমাম গাযালী, ২/২২৮, আল-মাহসূল, ইমাম রাযী, ৫/৫] কিয়াস যে শরীয়াহ্-এর উৎস ও প্রমাণ সে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহের বহু দলীল রয়েছে। [বিস্তরিত দলীলসমূহ জানার জন্য দেখখুন, আল-কিয়াস ফিল ইবাদাত, পৃঃ ১৮৫-২২৫]
এগুলোর পাশাপাশি ইসলামী শরীয়াহ্-এর কয়েকটি আনুসাঙ্গিক ও গৌণ উৎস রয়েছে, যথাঃ মাসালিহ মুরসালাহ, ইস্তেহসান, ইস্তেসহাব ইত্যাদি। এগুলোর প্রত্যেকটিই কুরআন ও সুন্নাহ্ এর এর সমর্থনপুষ্ট ও এতদুভয়ের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।